মাসুদ পথিক

চলচ্চিত্রের সেন্সরশিপ তুলে দেওয়া উচিত মাসুদ পথিক


 

[‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’খ্যাত নির্মাতা ও কবি মাসুদ পথিক-এর কাছে  জানার ছিল বাংলাদেশের ফিল্ম নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর। অথবা সিনেমার অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা নানা তর্ক-বিতর্ক কিংবা ফিসফাস নিয়েও কথা চললো বটে। সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিলেন জুয়েইরিযাহ মউ জুন ২০১৫ তে।]

 

প্রশ্নপর্ব তবে এভাবে শুরু করা যায় যে বাংলাদেশের ফিল্মের বর্তমান অবস্থা কী?

এক শব্দে বললে ‘সম্ভাবনাময়’।

ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে দর্শককে সিনেমা হলে আনতে হবে এ ব্যাপারে নির্মাতারা ভাবছেন, আবার অপর দিকে এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করার ব্যাপারেও আগ্রহ জন্মাছে, এ দুটো কি ক্ল্যাশ করে কোথাও? বা এ দুটো পাশাপাশি ধরে রেখে কাজ করা কতটা সম্ভব?

আমাদের দেশে প্রতিটি সৃষ্টিশীল কাজের পেছনেই দুটো জিনিস প্রভাব বিস্তার করে, কালচারাল ডেভেলপমেন্ট এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এ দুটোর প্রভাবেই শিল্প বিকশিত হয়। এই সৃষ্টিশীল কাজগুলোর মধ্যে ফিল্ম একটা। এখন আমার ব্যক্তিগত অভিমত হল– ভালো কাজ করা নির্মাতার দায়িত্ব আর বাজার নিয়ে ভাবা প্রডিউসারের দায়িত্ব। দুঃখজনক যে আমাদের দেশে সমন্বয়টা ঠিকঠাক ভাবে হচ্ছে না। অনেক ভালো কাজ এখানে মার্কেটিং এর কৌশলগত ব্যর্থতার কারণে বাজার পাচ্ছে না। এখন গতানুগতিক ফর্মুলায় বসিয়ে তৈরি ফিল্মগুলোকে যেভাবে প্রমোট করা হয় কোন সিরিয়াস কাজকে কি আদৌ সেভাবে প্রমোট করা হচ্ছে? মানুষের কাছে ব্যতিক্রমধর্মী কাজগুলোকে পৌঁছোনোর চিন্তা প্রযোজক, পরিবেশক, হল মালিকদের মধ্যে না থাকার কারণেই এই দুটো ভাবনার সমন্বয় সাধন কঠিন হয়ে পড়ছে। ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ বা ‘অনীল বাগচির এক দিন’ বাংলাদেশের কয়টা হলেই দেখানো হলো বা হবে? যারা পরিবেশনার দায়িত্বে থাকেন বা হল মালিকেরা ভাবছেন ‘পাব্লিক খাবে না’, কিন্তু কেউ এটা ভাবে না যে আগে দিয়ে তো দেখি, মানুষ নেয় কী নেয় না।

নিজে কাজ করার ক্ষেত্রে কোনটাকে বেশি প্রাধান্য দেন, নতুন ধরণের কাজ করতে হবে না দর্শক হলে আনতে হবে?

আমার মনে হয় না মার্কেটিং নির্মাতার দায়িত্ব। ভাল ছবি বানাতে হবে এটাই মাথার রাখার চেষ্টা করি ব্যক্তিগতভাবে।
এখন ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনার দিকে ঝুঁকছেন অনেক তরুণ, এমন কি নতুন নির্মাতারাও। তো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনার প্রভাব বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে কতটা পড়বে বলে মনে হয়?

প্রাতিষ্ঠানিক আর অপ্রাতিষ্ঠানিক দু’ক্ষেত্রেই পড়াশোনা হচ্ছে। ভালো, পজিটিভ। প্রাতিষ্ঠানিক way-তে কিছু নিয়ম-কানুন থাকে কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। ঋত্বিক, সত্যজিৎ এরকম ক’জনই বা প্রতিষ্ঠাননির্ভর চর্চার মাধ্যমে ফিল্ম-মেকার হয়ে উঠেছিলেন। তাই বলে আমি নাকচ করে দিচ্ছি না, শুধু বলতে চাইছি শেখার প্রক্রিয়া বড় ব্যাপার না, কী শেখা গেল সেটাই বড় বিষয়।

‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ অনুদানপ্রাপ্ত ছবি। এখন অনুদান নিয়ে অনেক কথা ওঠে। বাংলাদেশে অনেকক্ষেত্রেই বলতে শোনা যায় অনুদানের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি লক্ষ্যনীয়। এ ব্যাপারে আপনার কী মত?

বাহ্ ভালো প্রশ্ন। দেখো এটা একটা প্রক্রিয়া, যাচাই-বাছাই এর মাধ্যমে এটা সম্পন্ন হয়। ইরানে বর্তমানে শতাধিক অনুদান দেওয়া হয়। অনুদান তো বিষয় না, ভালো ছবি করার কমিটমেন্ট আছে কি না সেটা বিষয়। আর এসব প্রশ্ন হাজার বছর ধরে উঠে এসেছে, উঠতেই থাকবে। দেড়শ-র মধ্যে পাঁচ জন অনুদান পায়, বাকিদের মনে হতেই পারে যোগ্য ব্যক্তি অনুদান পায়নি। কারণ সবাই নিজেকেই যোগ্য ভাবে সেটাই স্বাভাবিক। কী নিয়ে এই দেশে বিতর্ক হয় না বলো। কবিতা নিয়েও তো হয়। বিতর্ক কাজেরই অংশ। তাছাড়া বাংলাদেশে বেকার সমস্যাও প্রকট এটাও এর পেছনে একটা কারণ। তুমিই দেখো পরিবারে দশ জন থাকলেই মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়। এসব নিয়ে ভাবলে তো জীবনেও কোন কাজ করা সম্ভব না।

আচ্ছা তবে এখন বলুন ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ ছবিটা নিয়ে আপনি নিজে কতটা সন্তুষ্ট? দৃশ্যায়ন, চিত্রনাট্য বা অন্য যেকোন ব্যাপারে আফসোস আছে কোনো?

সন্তুষ্টও না অসন্তুষ্টও না, এটা জীবনেরই অংশ। জীবন আর নির্মাণের ভেতর কিছু ত্রুটি থাকেই।

সেটাই সেই ত্রুটিটা তবে কী ?

আমার চোখে তো ত্রুটি ধরা পড়ার কথা না। এটা দেখার দায়িত্বও আমার না। ত্রুটি ব্যাপারটাই তো আপেক্ষিক। তবে মনে হয় আরও টাকা হাতে থাকলে হয়তো ভালো হতো। অনুদানে পেলাম মাত্র চব্বিশ লাখ আর ছবি এক কোটি পাঁচ লাখ টাকার। সারা বিশ্বে যদি ছবিটা দেখাতে পারতাম তবে ভালো হতো। এরকম মনে হয়। মেকিং এর ত্রুটি তেমন নেই আমার মতে।

কী কী কাজ হাতে নিয়েছেন এখন?

তিনটি ছবির কাজ শুরু করেছি এই মুহূর্তে। মায়া-দ্য লস্ট মাদার, শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের চিত্রকর্ম ‘ওমেন’ ও কবি কামাল চৌধুরীর কবিতা ‘যুদ্ধশিশু’ অবলম্বনে সিনেমাটির কাহিনীচিত্র নির্মিত। পোয়েট্রি, কবিগাছ – এই ফিল্মটি নির্মলেন্দু গুণ এর ‘মানুষ’ কবিতাটি ভেবে লেখা । সঙ্গে আছে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘অমলকান্তি’ কবিতার অনুপ্রেরণাও। আরেকটা ফিল্ম হবে শিল্পী শাহাবুদ্দিন-এর ‘ওয়েটিং’ চিত্রকর্ম অবলম্বনে ‘কালার অব ওয়েটিং’ বা প্রতীক্ষার রঙ নামের একটি ফিল্ম। এইতো…

এই যে একজন নির্মাতা একই সাথে একের অধিক ফুল লেন্থ ফিল্ম নিয়ে কাজ করেন সেক্ষেত্রে কি কাজের প্রতি অবিচার করা হয় বলে আপনি মনে করেন?

এই কাজগুলোর প্রি-প্রোডাকশান একসাথে হলেও কাজ তো একটার পর একটাই হবে। আর দু’চার বছর যদি চার-পাঁচটা কাহিনী মাথায় নিয়ে ঘুরতে পারি তবে কাজও সমান তালে চলতেই পারে। আমার মনে হয় না অবিচার করা হয়।

কবি মাসুদ পথিক আর নির্মাতা মাসুদ পথিকের মধ্যে মিল এবং অমিলগুলো কী কী?

আমি তো এভাবে বলি- কবি, কবি তারপর নির্মাতা। দু’বার কবি পরিচয়ের পর নির্মাতা পরিচয় এর কথা আসবে। কবিতার সাথে আমার ফিল্ম এর আত্মিক সম্পর্ক আছে। আমার মতে ফিল্ম মানে শুধু গল্প বলা নয়। কবি আর নির্মাতা দুজনেই ইমেজ তৈরি করতে চাইছে। ফিল্মে দেখা যায় আর কবিতায় কল্পনা করে নিতে হয়। আর অমিল হল একটা প্যাড আর কলম হলেই কবিতা লেখা চলে কিন্তু নির্মাতা মাসুদ পথিককে টিম ওয়ার্ক জানতে হয়।

বাংলাদেশের ফিল্মগুলো অনেক বেশি ফিকশন নির্ভর এর কারণ?

বিনোদনের অভাব। মানুষের জীবনে এখানে বিনোদন কই? মানুষ ফিল্মের কাছে আসে বিনোদনের জন্য। একারণে এমন হয়।

আমরা কবিতার মতোন ওপেন এনডেড ফিল্ম কি পাবো না বাংলাদেশে?

এক হাজার জনে দেখা যায় পাঁচ জন দায়বদ্ধতা থেকে আসে, বাকি বেশিরভাগ কিন্তু বিখ্যাত হতেই আসে। আসলে আমরা কালচারালি ডেভেলপড না এখনো। তাছাড়া ফিল্ম মেকাররা যা দেখাতে চাইছে সবসময় তা দেখানোর ছাড়পত্রই তো পাওয়া যাচ্ছে না। এটাও কারণ।

ফিল্মগুলো অনেক বেশি সংলাপনির্ভর, এটাকে কি ভাবে দেখেন?

শিল্প ভাবনায় এখনো পরিনত চিন্তা-ধারা প্রবেশ করেনি সামগ্রিকভাবে। তাছাড়া চারদিকে এতো কোলাহল। দেখো তোমার সাথে বসে কথা বলতেও আমাকে জোরে কথা বলতে হচ্ছে। দর্শক বেডরুমে বসে ফিল্ম দেখতে চাইছে। সবকিছু মিলিয়ে নেরেটিভ ফিল্ম দর্শকরা পছন্দ করছে। আস্তে আস্তে ইমেজধর্মী ফিল্মও আসবে। কিন্তু এই পরিস্থিতি তৈরি হতে সময় লাগবে। দর্শক নেওয়া না নেওয়ার ব্যাপার থাকে।

মানুষ নেয় না না কি নির্মাতারা ঝুঁকিই নিতে চাইছেন না?

নির্মাতারা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না এটাও তো বাস্তবতা। টাকা উঠে আসার বিষয় তো আর একেবারে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। টাকা দাও বানাই নাহয়।

হাহাহাহাহা, সিনেমা হলগুলোর কী অবস্থা?

টোটাল সিস্টেমটাই ষড়যন্ত্র, ইন্টারনাল পলিটিক্স এসবের জন্য এমন হযবরল অবস্থানে। আমার মতে ছোট ছোট হল থাকা খুব জরুরী। এই আজিজে (আজিজ সুপার মার্কেট) ছোট্ট একটা সিনেমা হল থাকতেই পারতো। বা বিভিন্ন জায়গায়, শহরে-মফস্বলে … এসব নিয়ে ভাবা দরকার, হলের পরিবেশ নিয়েও।

বিকল্প ধারার পরিচয়ে যে ছবি আসছে তা কি সাধারণ মানুষকে হলে আনতে পারবে বা সাধারন মানুষ এর মাঝে সেই ছবিগুলোকে নিয়ে যাওয়ার কি কোন চেষ্টা করা হচ্ছে? যেমন তারেক মাসুদ ‘রানওয়ে’ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছুটে গিয়েছিলেন।

হচ্ছে তো। আমিও তো সেদিন গুণদার জন্মদিনে ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ দেখালাম দর্শনী ছাড়াই। একেবারে যে হচ্ছে না তা তো নয়।

বিদেশী ফিল্ম আমাদের দেশে দেখানো নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল। আপনি কিভাবে দেখেন বিষয়টিকে?

বিতর্কের কিছু নেই। বিশ্বায়নকে মেনে নিতে হবে। ইন্ডিয়া বা অন্য দেশ থেকে অন্য প্রোডাক্ট তো আসে, ফিল্ম আসবে না কেন? কিন্তু ওদের পাঁচটা আনলাম আমাদের ১টা গেল তা যেন না হয় সেটা খেয়াল রাখতে হবে। তখনই কিন্তু মানের প্রশ্ন চলে আসবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে মার্কেট ওপেন রেখেই নিজেদের উন্নত করতে হবে। এটাই লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।
সেন্সরশিপ সিস্টেমের ব্যাপারে কথা বলতে চাইছিলাম, দেখুন অন্য আর্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হচ্ছে না অথচ ফিল্মে ছাড়পত্র লাগছে। আবার কোন কোন ফিল্ম একবার আটকাচ্ছে তো পর মুহূর্তে ছাড়া হচ্ছে…

সেন্সরশিপ তুলে দেওয়া উচিৎ। একটা গ্রেডেশন সিস্টেম থাকতে পারে। এরকম নিয়ম থাকতে পারে যে উল্লেখ করা থাকবে প্রাপ্তবয়স্করা ছাড়া এই ফিল্ম দেখা যাবে না। বাকিটুকু মানুষের মানসিকতার উপর ছেড়ে দেওয়া উচিৎ বলে মনে করি। কোনো ফিল্মই আটকে দেওয়া ঠিক না। এটা ফিল্ম আন্দোলনের জন্য ক্ষতিকর।

ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করে সে বিষয়ে ফিল্ম নির্মাণের প্রতি কি আমরা উদাসীন? দেশ ভাগ, ৫২, ৭১ কি আমাদের চলচ্চিত্রে ততটা উঠে আসে যতটা আসার কথা ছিল?

আমাদের এখানে খণ্ডিত স্টাডি হয়। বেসিকটা তৈরি হয় না অনেক সময়। নান্দনিক চেতনার অভাব দেখা যায়। আরেকটা জিনিস হল পরিশ্রমের অভাব। ইতিহাস নিয়ে ফিল্ম বানাতে হলে পরিশ্রমতো করতেই হবে।

ইতিহাসের রিপ্রেজেন্টেশন কেমন হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন? যেমন ‘মেহেরজান’ নিয়ে বিতর্ক হল। এটা কিভাবে দেখেন?

আমি নির্দিষ্ট কোন ছবির নাম নিয়ে কিছু বলতে আগ্রহী নই। তবে ইতিহাসের রিপ্রেজেন্টেশন নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় ইতিহাসকে তার নিজস্ব গতিতে হাঁটতে দেওয়া উচিৎ। ফিল্মে তাকে ব্যবহার করার সময়ও এটা মাথায় রাখতে হবে নিশ্চয়।