এনামুল করিম নির্ঝর

মানুষের মনটাই একটা সেন্সর বোর্ড এনামুল করিম নির্ঝর

 

[এনামুল করিম নির্ঝর। একজন মেধাবী স্থপতি, চলচ্চিত্র নির্মাতা, আলোকচিত্রী, লেখক, গীতিকার, সুরকার এবং সংগঠক। স্থাপত্যকলার জন্যে পেয়েছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। পুরস্কৃত হয়েছেন আলোকচিত্রের জন্যেও। প্রথম সিনেমা ‘আহা!’ বানিয়ে চার শাখায় পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পেয়েছেন আমন্ত্রণ, হয়েছেন প্রশংসিত। সমাদৃত হয়েছে তার গান। সামগ্রিক বিষয় নিয়ে তানভীর আশিক-এর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।]

 

অনেকে বলেন আপনি অস্থির, সে কারণেই কি শিল্পচর্চায় আপনি বহুমাত্রিক? আপনি কবিতা লিখেছেন, গান লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন, ফটোগ্রাফি করেছেন, সিনেমা তৈরি করেছেন, স্থাপত্যকলায় আপনার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। আপনার এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু বলুন?

আমি কিছু অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করেছি মাত্র। এখন সেটাকে কাজে লাগিয়ে একটা কিছু শুরু করতে চাই, যা অন্যরা শেষ করবে এবং ওই ‘একটা কিছু’ শুরু করতে গেলেই গভীর বিশ্বাস এবং নিজের ওপর আস্থা প্রয়োজন। আমার ঘরে যদি একশ’ জানালা থাকে, সেটা দোষ নাকি ঐশ্বর্য? যত জানালা তত আলো, তত চোখ খুলে দেয়ার চেষ্টা। যতকিছু দেখব, ততই ভাবব এবং ততটাই শেয়ার করতে চাইব। প্রকৃত ভালো কাজ করার জন্যে অনুশীলন হিসেবে এটা খুবই জরুরি। ধরুন, ট্রেনে উঠছি, চুপচাপ একটা জায়গায় বসে চারপাশের মানুষের চেহারাগুলো পড়তে শুরু করলাম, দোষ করলাম? কিংবা ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের চলমান দৃশ্য গিলতে শুরু করলাম, এটা দোষ? ট্রেনে চড়েই যদি টিফিন ক্যারিয়ার খুলে নিয়ে আসা সব খাবার খেয়ে সবাইকে দেখাতে শুরু করি, তবে? অথবা সামনের আসনে সুন্দরীকে দেখে নানা কায়দায় খাতির জমাতে চাইলে? আবার সব বাদ দিয়ে ট্রেনের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত যদি আমি ঘুরে ঘুরে মানুষের সঙ্গে যুক্ত হতে চেষ্টা করি তবে কি দোষ? যদি দোষ না হয় তাহলে ধরে নিন আমি শেষেরটাই চেষ্টা করছি আর এটা করতে চাইলে আত্মবিশ্বাস দরকার। ধাপে ধাপে এগিয়ে এসে পিছিয়ে গিয়ে একটা পর্ব শেষ করেছি মাত্র। মফস্বল শহরের নিঃস্ব অবস্থা থেকে রাজধানীতে এসে প্রতিষ্ঠিত হলেও নিজস্ব মৌলিক অবস্থান থেকে খুব বেশিদূরে চলে যাইনি এখনো। ঠকেছি অনেক, ঠকাইনি তো কাউকে! অনেক অনেক ভুল আবার অনেক ঠিক করেছি, সবটাই দরকার ছিল। কারণ আমার সত্যটা তো আমার চেয়ে কেউ বেশি জানে না। যে ভুল বুঝবে সে তো ভুল বোঝার জন্যেই অপেক্ষা করছে।

তাহলে এটা কি আপনার এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যেই?

না না, সেটা তো মূল প্রক্রিয়ার একটা অংশ মাত্র। বলতে পারেন প্রধান অংশ। আসলে একটা প্রসেস বা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠতে না পারলে তৃপ্তি কি আসে? তার মানে এই একেকটা কাজের জন্যে চেষ্টা করা, সেটা সেই ১৯৭৮ সালের বালকসুলভ একক চিত্রপ্রদর্শনী, বন্ধুর কাছ থেকে ক্যামেরা ধার করে নিয়ে ছবি তোলা শুরু করে কিছুদিন সিরিয়াস আলোকচিত্রী হয়ে যাওয়া, ১৯৮২ সালে কবিতার বই প্রকাশ, ঢাকায় এসে পত্রিকায় লেখালেখি করে জীবন চালানো, গ্রাফিক ডিজাইন-মুদ্রণশিল্পে জড়িয়ে পড়া, ১৯৯২ সালে মধ্যবিত্তপাড়ায় যোজন আর্ট গ্যালারি খুলে ফেলা, একটার পর একটা রেস্টুরেন্ট ডিজাইন করতে করতে স্থাপত্য পেশায় ঢুকে পড়াÑ পুরোটাই তো প্রক্রিয়া।

তার আগে কিছুদিন ক্যাডেট কলেজ, তারপর রাজশাহী কলেজ, তারপর ডাক্তারি, অবশেষে বুয়েটে আর্কিটেকচার পড়া?

আসলে এগুলো সব ওই জার্নিরই অংশ। সবটাই দরকার ছিল। যেমনÑ ক্যাডেট কলেজ আমাকে আত্মবিশ্বাসী হতে শিখিয়েছে আবার ওই বয়সে বুদ্ধি করে কি করে নিয়ম ভাঙতে হয় সেটাও শিখিয়েছে। দু’বছরের অ্যানাটমি একটু হলেও সৃষ্টির মূল রহস্যের ডিটেইলিংয়ের কাছে নিয়ে গেছে, অ্যানাটমিই তো গন্তব্য। আর আর্কিটেকচার তো আমার জীবনের শৃঙ্খলা।

তাহলে সিনেমা, গান, লেখালেখি বা আলোকচিত্র?

এসব হচ্ছে নিঃশ্বাসের অংশ। তবে হ্যাঁ, বড় বড় কথা বললেও তেমন কোনো ভালো কাজ এখনো করতে পারিনি, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

বুয়েটে পড়ার সময় ‘বিভাজিত উপাখ্যান’ নামে একটি মঞ্চনাটক করেছিলেন। তাতে আপনার সঙ্গে কারা কাজ করেছিলেন? সেই স্মৃতি মনে আছে?

এ আবার কোত্থেকে জানলে ভাই? এ বিষয়ে কখনো জানতে চায়নি কেউ। বিভাজিত উপাখ্যান! ব্যাচমেট-বন্ধুরা মিলে সেকেন্ড ইয়ারে আমরা চিহ্ন নামে একটি সংগঠন করেছিলাম ১৯৮২-৮৩ সালে। জগলুল, হাবিব, সামিয়ান, শাহিন, মিনহাজ, রানা, কাউসার, শান্তনু, জাহিদ, জাকিয়া, ফরিদসহ অনেকে। সঙ্গে ফার্স্ট ইয়ারের আরিফ, জাকি, নকী, চুন্নু, জেরিন, তাজু, মামুন... সরি অনেকের নাম ভুলে গেছি, কেউ মাইন্ড না করে। মনে হয় তখন ওরা আমাকে পছন্দ করত। আর আমি তো মফস্বল থেকে এসেছি, ঢাকা শহর জিতে নিতে হবেÑ এ রকম খায়েশও বোধহয় ছিল। একটু-আধটু গান লিখতাম, গাইতাম, পত্রিকায় লেখা-টেখা ছাপা হতো। তো ওদেরকে যখন বললাম, সিনিয়রদের দিকে গিয়ে আমাদের সময়টা থেকেই কিছু একটা শুরু করি। সে কি উৎসাহ! তাজুর সহায়তা নিয়ে নাটকটা লিখে ফেললাম ঝটপট। তারপর নির্দেশনা। তখন বুয়েটে যেভাবে নাটক হতে দেখেছি খুব পরনির্ভর। স্ক্রিপ্ট, ডিরেক্টর, নারী চরিত্র সব আসত বাইরে থেকে। আমাদের যে অডিটোরিয়াম সেটা ব্যবহারে ছিল কড়া নিয়ম। পোশাকি অনুষ্ঠানের জন্যে ব্যবহার হতো। গেলাম ভিসি স্যারের কাছে। তিনি যথারীতি বললেন, নাটক করবে কেন? পড়াশোনা কর, এসব হবে না। তখন আমরা ঠিক করলাম, দুটি নাটক করব উন্মুক্ত মঞ্চে। ইনামুল হক স্যারকে ভিসি মহোদয় দায়িত্ব দিলেন আমাদের মান বুঝতে। স্যার তো মহাখুশি। বোঝালেন ভিসিকে। ওই নাটকে স্থাপত্যের ছাত্রী জেরিন আর শুকতারা সাহস করে এগিয়ে এলো অভিনয় করতে। নাটক মঞ্চায়ন হলো ফার্স্ট ইয়ার আর সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্টদের কাজ দেখে ভিসিসহ সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

ছেলেবেলার কোন ঘটনা আপনাকে প্রভাবিত করেছে?

স্বাধীনতার ঠিক আগে আমার বাবা দিনাজপুরে তার সর্বস্ব ঢেলে নতুন বাড়ি তৈরি করেছিলেন। আমি তখন শিশু। ঘরের খেলনাই আমার জগৎ। যুদ্ধ শুরু হলো। এক রাতে মায়ের হাত ধরে সারারাত হেঁটে অবশেষে ভারতের শরণার্থী। স্বাধীনতার পর ফিরে এসে তো দেখি সব ছাই। কিচ্ছু ছিল না। শিক্ষক বাবা ক্লাসে পড়ানো ছাড়া অন্য কোনোভাবে উপার্জনের রাস্তা খোঁজেননি কখনোই। সব হারিয়ে তিনি ডুবে আছেন হতাশায়। সে সময় আমার জন্যে একটাই জরুরি কাজ ছিল, কীভাবে তাকে শক্তি দিতে পারি। তার মানে যখন যেটা দরকার সেটাই নিজেকে তৈরি করা। যে কোনো অর্জনের স্পৃহা হয়তো একটা অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয়।

কী রকম?

এটা একদম আমার নিজের ধারণা। কোনো রেফারেন্স না ঘেঁটে নিজের অভিজ্ঞতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি বলি। মা-বাবা এবং নিজের দেশকে বাদ দিয়ে তো ভাবনার সত্যটাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেটা বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দুর মতো। এই বিন্দুটাই প্রক্রিয়ার আকাশটাকে নির্মাণ করে।

যেটুকু এলেন, এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন মনে হলো কোনটি?

স্বার্থপরদের ক্ষমা করে দেয়া, বন্ধুদের হিংসা সামাল দেয়া। আবর্জনায় বাস করেও শরীরে না লাগতে দেয়া (যদিও সবাই ব্যস্ত ময়লা লাগাতে, সেটাকে পাত্তা না দেয়া), অনুশোচনা না করা এবং সত্যিকারের ভালো কাজে কারো কাছ থেকে উৎসাহ আদায় করে নেয়া... এই তো।

সিনেমা বানাবেন এমন চিন্তা মাথায় এলো কখন? এগোলেন কীভাবে?

যখন একটু বুঝলাম আমার ভাবনার ভেতরে কিছু গল্প আছে, যেটা সিনেমার ভাষা ছাড়া অন্য কোনোভাবেই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আর যেহেতু শৈশবের বেড়ে ওঠার ধাপগুলো বিভিন্ন ঘটনার অলিগলি পেরিয়ে এগিয়েছে, তখনই প্রক্রিয়া বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়েছি। শিল্পকলার বিভিন্ন মাধ্যমকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। যেটা একজন স্থপতি অথবা চলচ্চিত্র নির্মাতার জন্যে খুবই জরুরি বিষয়। আর্কিটেকচার প্র্যাকটিস শুরু করে মনের ভেতর যুদ্ধটা আরো প্রবল হলো। রাজনৈতিক রোমান্টিসিজম, মনন বা চেতনা যেটাই বলুন, জেগে থাকলে বলার ইচ্ছেটা আরো প্রবল হয়। ফিল্ম মেকিংয়ের ডিসিপ্লিনটা আর্কিটেকচারে কিংবা আর্কিটেকচারের ডিসিপ্লিনটা ফিল্ম মেকিংয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ায় যদি যুক্ত হয় তাহলে একটা অন্য শক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদিও আমার সীমিত মেধায় সেটা উচ্চাকাক্সক্ষা, তবু চেষ্টা করতে দোষ কী? আমি মনে করি, সত্য থেকে দূরে সরে গেলে বা মনের ভেতর একবার ভয় ঢুকে গেলে সৃজনশীল কাজ করা আর সম্ভব হয় না। আমি ঠিক যে ধরনের স্থাপত্য বা চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করতে চাই, সেটাতে দুটো মাধ্যমই অনুপ্রেরণার ছায়াশক্তি হতে পারে অনায়াসে।

‘আহা!’ তৈরির আগে আপনি বেশকিছু প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছেন। এটা কী সিনেমা বানানোর জন্যে এক ধরনের প্রস্তুতি ছিল?

সে তো বটেই। একটা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এগোতে চাইলে নানা ধরনের প্রস্তুতি এবং অনুশীলনের বিকল্প নেই। শুধু প্রামাণ্যচিত্রই নয়, বরং ফটোগ্রাফি, মিউজিক, মঞ্চসজ্জা, বিজ্ঞাপন, ইন্টেরিয়র থেকে শুরু করে যা কিছু আজ পর্যন্ত চেষ্টাÑ সবই এক জায়গায় যুক্ত করার আশায়। হ্যাঁ, বিষয়টি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। কিন্তু এটাই হয়তো আমি এবং এভাবেই আমার লক্ষ্য স্থির করব। এই অভিজ্ঞতা আমাকে মজবুত করছে দিন দিন। এখন কাজে হাত দেব।

তার মানে আগের কাজগুলো...?

হ্যাঁ, ওগুলোও কাজ। তবে অধিকাংশই অনুশীলনের অংশ। প্রচুর কনফিউশন থাকলে যা হয় আর কী। ছেলেমানুষী, অপরিপক্বতা রয়েছে প্রচুর।

বিষয়টা কি আরেকটু খুলে বলবেন?

দেখুন, আমরা যে সময়টায় বাস করছি সেটাই কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্য। আবার এ সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় লড়াই করতে হচ্ছে মিথ্যার সঙ্গে। শিল্পী তো বারবার হেরে গিয়েও জেতার স্বপ্ন দেখবে। এই স্বপ্ন আর লড়াইয়ের মধ্যে বুদ্ধিটাকে পচনের হাত থেকে বাঁচাতে অনুশীলন হতে পারে অন্যতম অস্ত্র। অনেক ভালো ভালো কাজ তো হয়েই গেছে, নতুন কিছু আবিষ্কার করার চেষ্টা তো আপসকামী মানসিকতা দিয়ে হয় না। পৃথিবীতে নতুন কত কিছু হচ্ছে শিল্পকলায় আর আমরা নিজেদের বোকা বোকা ‘মূর্তি’ বানিয়ে ফুটানি করছি অযথাই। যে সময়টায় ভালো ও পরিণত কাজ শুরু হওয়ার কথা তখন মৃত্যু ঘটছে মেধাবীদের। তার থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে অনুশীলনের অভিজ্ঞতা শক্তি জোগাতে পারে।

এমন কী হয়েছে আপনার, যেমনটা ইনারিতু বলেছেন, ইলমাজ গুনের ‘ইয়োল’ দেখার পর তার মনে হয়েছে সিনেমা তাকে বানাতেই হবে... এমন কিছু? অর্থাৎ কোনো সিনেমা কি আপনাকে সিনেমা বানাতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে?

প্রচুর সিনেমা দেখেছি। ভালো-মন্দ দুটোই। কোনোটা দেখে মনে হয়েছে কীভাবে বানাল এটা? নির্মাণ-কৌশল সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কোনোটা দেখে আচ্ছন্ন হয়ে থেকেছি। তবে নির্দিষ্ট কোনো সিনেমা দেখে মনে হয়নি আমাকে সিনেমা বানাতেই হবে। মানুষের জীবনে প্রতিটি দিনই তো কত গল্প তৈরি হয়। আমার মনে হয়েছে যে, গল্পটা আমি জানি এবং ভাবনায় বহন করছি, সেটাকে আমার মতো করে বলতে গেলে সিনেমাটা দরকার।

‘আহা!’র পর ‘নমুনা’ তৈরি করলেন সরকারি অনুদানে, সেন্সর বোর্ড আটকে দিল কেন?

‘নমুনা’র স্ক্রিপ্ট দেখে সরকার অনুমোদন দেয়। আমি সিনেমা তৈরি করেছি। ‘নমুনা’ দেখে তারা বলেছেন, এই সিনেমা দেখার জন্যে আমাদের দেশের মানুষ এখনো মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। আমাকে মুখ্য অংশ কাটতে বলা হয়েছে। কিন্তু আমি আমার চিন্তাকে কেটে ফেলে দিতে চাইনি বলে এখনো পড়ে রয়েছে অন্ধকারে।

কী বলতে চাইলেন ‘নমুনা’য়?

যেটা সেন্সর না বলেছে, আমার আর বলা কি ঠিক হবে? এক কথায় বললে, গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত যদি সহিষ্ণুতা হয়, তবে সেটা নিয়েই অনুশীলন। মাঝখান থেকে এতগুলো টাকা আটকে গিয়ে আমার ছবি বানানোও থেমে থাকল।

সিনেমায় সেন্সরের বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখেন? মানে সেন্সরের কি প্রয়োজন আছে?

শৈশবে আমার বাবা শিখিয়েছিলেন তোমার মনটাই একটা সেন্সর বোর্ড, তুমি নিজের বিবেক দিয়ে চল। সেই অর্থে মানুষের মনটাই একটা সেন্সর বোর্ড। এখন এটা বলে তো লাভ নেই। যে দেশের মানুষ নিজের দেশকে ভালোবাসতে জানে না, শেখেনিÑ তাদের ভালোবাসতে শেখাতে হবে। আপনি কালকে সেন্সর বোর্ড তুলে দেন দেখবেন ওরা যাচ্ছেতাই সিনেমার নামে চালিয়ে দেবে। আমার দেশের মানুষকে তো শিক্ষিত করা হয় না। শিক্ষার নামে যা দেয়া হয় তাতে করে শিল্পকে ধারণ করার মতো বিবেক তৈরি হয় না। এই দেশের জন্যে শতভাগ সেন্সর বোর্ডের প্রয়োজন। তবে হ্যাঁ, যাদের সেন্সরে দেয়া হবে তাদের মধ্যে শিল্পবোধ থাকা প্রয়োজন। কোনটা শিল্প, কোনটা অশ্লীলতা, সেটা বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। সেন্সর বোর্ড থেকেও যদি অশ্লীল সিনেমা হলে দেখানো হয়, তবে এমন সেন্সর বোর্ডের প্রয়োজন কী?

ভারতীয় সিনেমা আমদানি করার বিষয়ে আপনার মতামত কী?

আমি স্ববিরোধিতায় বিশ্বাসী নই। ‘দেখব এবার জগৎটাকে’Ñ বলে ছেলেবেলায় এগিয়ে দিয়ে এখন যদি বলেন দু’চোখে কালো কাপড় বাঁধ, তা কি শুনব? দেশের বাণিজ্যস্বার্থ বা সংস্কৃতিস্বার্থ কি আসলে টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে? আপনি কি ভারতীয় সিনেমার ডিভিডি কেনেন না? আপনি কি দেখেন না ভারতীয় চ্যানেল? ভারতীয় শাড়ি পরতে পারবেন আর সিনেমা দেখতে সমস্যা কী? আপনি তো দেখছেনই ভারতীয় সিনেমা। এখন চুরি করে ডিভিডিতে দেখছেন। পরে সিনেমা হলে দেখবেন। আপনি তো আছেনই এর ভেতরে। আমাদের সব দেশের সিনেমা দেখতে হবে। চুরি করে দেখাকে সাপোর্ট দেব আর যখন টাকা দিয়ে দেখবেন তখন বিরোধিতা করব! আগে ভাবতে হবে সিনেমাটা আমরা রাখব কিনা! যদি ভাবেন যে হ্যাঁ, সিনেমা আমরা রাখব তখন নীতিমালা করেন, চিন্তা করেন। হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু করে ফেলাটা তো নতুন কিছু নয়। আমরা তো হুটহাট জাতি। বাইরের দেশের ভালো সিনেমা না দেখলে আপনার সিনেমার অগ্রগতি আপনি কীভাবে বুঝবেন? অবশ্যই বাইরের ছবি আসবে, তবে তা বৈধ উপায়ে। একটা দেশের ১০টা ভালো ছবি আসুক। আর আমাদের ছবির মান ও পরিমাণ বাড়াতে হবে। ওই ভালো ছবিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো মানসিকতাও থাকতে হবে। দর্শক এখন আর বোকা নেই, আগেও ছিল না।

আপনি, গিয়াসউদ্দিন সেলিম, নূরুল আলম আতিক, গোলাম রাব্বানী বিপ্লব, তৌকীর আহমেদ, মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর মতো নির্মাতারা মিলে যদি বছরে দু’তিনটা, কমপক্ষে একটি করেও সিনেমা বানাতেন তবে আমাদের চলচ্চিত্র বদলে যেত। ২০০৫-০৭ সালের দিকে আপনারা যখন সিনেমা তৈরি করছিলেন, হয়তো বিচ্ছিন্নভাবেই আপনারা তৈরি করছিলেন। তবে আমরা ভেবেছিলাম আপনারা একটা প্লাটফর্ম তৈরি করতে যাচ্ছেন, হয়তো এবার বদলে যাবে আমাদের সিনেমা। কিন্তু এরপর হঠাৎ আপনারা থেমে গেলেন। আপনাদের এই স্থবিরতা কেন? আপনারা এক হয়ে কেন একটা প্লাটফর্ম তৈরি করতে পারলেন না?

এটার উত্তর কী আমি একা দিতে পারব? বেশ ক’বার উদ্যোগ নিয়েছি, কিছুটা এগিয়েছিও, কিন্তু কেন জানি এক ধরনের কমপ্লেক্সের উদয় হয়, কেউ একটু বেশি সফল, কেউ একটু কম, কারো বেশি যোগাযোগ, কারো কমÑ এটাই তো স্বাভাবিক। এই কম-বেশি বাস্তবতা সবাইকে যুক্ত করতে পারত একটা কমোন ইন্টারেস্টে। তাতে সবাই বর্তমান এবং ভবিষ্যতে ভালো কিছু পেতে পারত। দেখা যাক! আরেকটা বিষয় না বলে পারছি না। এ রকম একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোলে তো কিছুটা হলেও নিজ স্বার্থ ভুলে যেতে হয়। আর আড়ালে কথা না বলে যাকে নিয়ে মন্তব্য তার সামনেই বলার সাহস রাখতে হয়। এক ধরনের বন্ধুত্বের সততা না থাকলে এগুলো কখনোই দীর্ঘমেয়াদে সফল হয় না।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

যে জাতি ক্রমশ আত্মঘাতী, তাকে ফেরাতে হলে প্রয়োজন প্রচুর পজিটিভ এনার্জি। সেটা সিনেমা ভালোভাবেই দিতে পারে। শুধু কিছু বিচ্ছিন্ন নির্মাতা স্বপ্ন দেখলে তো হবে না। সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো এগিয়ে না এলে ঘোড়ার ডিম হবে...।

গান নিয়ে আপনি ‘গানশালা’ নামে একটি প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন। এ বিষয়ে যদি কিছু জানাতেন।

আমাদের দেশের অডিও শিল্পটাও ধ্বংসের মুখে। আমাদের মেধাস্বত্ব নেই। সিডি-ডিভিডি পাইরেসি হয়ে যাচ্ছে। কেউ কোনো কথা বলে না। এ রকম চলতে থাকলে শিল্পীরা আর গান করবে না। তারা শুধু টেলিভিশনে আর বিয়ে-বাড়িতে গিয়ে গান গেয়ে আসবে। ওই জায়গা থেকে চেষ্টা করছি একটা ডিসিপ্লিন তৈরি করতে পারি কিনা! আমি প্রতি বছর ১০১টা গান তৈরি করব আমার লেখা ও সুরে। এ বছরের কাজ শেষ, এবার ১১ জন তরুণ মেধাবী মিউজিশিয়ান নিয়ে কাজ করছি। তাদের যার যার অ্যারেঞ্জমেন্টে প্রায় ৪২ জন প্রবীণ ও নবীন শিল্পী গান গেয়েছেন। আমি একটা উদাহরণ তৈরি করতে চাই, রয়্যালিটির বিষয়ে। এই শিল্পীরা অনেক খেটেছেন, পরিশ্রম করেছেন, আমাকে বিশ্বাস করেছেন। একটা গান শুনলে তারা যদি ২৫ পয়সা করেও পায় তবু সেটা রয়্যালিটি হিসেবে পাবে। তার শ্রমের মূল্য পাবে। আমি যদি এগিয়ে আসি আমার দর্শক-শ্রোতারাও এগিয়ে আসবে। এটার জন্যে কঠিন একটা সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। এই সংগ্রামে যদি সবাই হেল্প করে আমি বিশ্বাস করি একটা পরিবর্তন আসবে। এটা পরিষ্কার। গানটা তো হবেই, এর সঙ্গে মিউজিক ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে। এতে কাজ করছে তরুণরা, যাদের বয়স ২০-২২। তাদেরও কাজ শেখার এবং করার একটা ক্ষেত্র তৈরি করা গেল। এখন দেখা যাক বাকিটা কী হয়!