ক্যাথরিন মাসুদ

চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে হলে যেমন প্রতিভা থাকতে হয় তেমন সাহস থাকতে হয় ক্যাথরিন মাসুদ


 

[তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এর আয়োজনে মার্চ ২০১৬ তে তৃতীয়বারের মতো  ‘তারেক মাসুদ উৎসব’ অনুষ্ঠিত হলো শিল্পকলা একাডেমীতে। তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট-এর চেয়ারপারসন এবং চিত্রনির্মাতা ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে চলচ্চিত্র অঙ্গন আর তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র ভাবনা কথা বললেন জুয়েইরিযাহ মউ। তার অনুমতি নিয়ে কথাবলিতে আবার প্রকাশ করা হলো। এই সাক্ষাত্কারটি পূর্বে বাংলামেইল২৪ডটকম এ প্রকাশিত হয় ।]

 

এবার উৎসবে তারেক মাসুদ স্মারক বক্তৃতা অংশে হলিউডের প্রাচ্য দর্শন নিয়ে কথা বলবেন সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট এর সহযোগী অধ্যাপক বীরেন দাশ শর্মা। এ ব্যাপারে কিছু যদি বলতেন বিস্তারিত...

আমরা তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট-এর পক্ষ থেকে চেষ্টা করি প্রতি বছরই তাঁর জন্মদিনের মাসে উৎসব করতে, গত মাসে আমি ছিলাম না বলে এ মাসে করা হচ্ছে। প্রথম দিনের আয়োজনে স্মারক বক্তৃতা দিতে বীরেন দাশ শর্মা এসেছেন কলকাতা থেকে। আসলে তারেক আর বীরেন দাশ শর্মা বহু দিন ধরে পরিচিত ছিলেন।  তারেক প্রথম ‘চিত্রবাণী’ আয়োজিত একটি কর্মশালা করেছিল সেই ১৯৮২ বা ৮৩ এর দিকে, সেই কর্মশালায় বীরেনও ছিলেন তারেকের সাথে। তখন থেকে এই পরিচয়ের শুরু। এরপর দীর্ঘদিন। আমি আর তারেক, কলকাতা গেলেই বীরেনের সাথে দেখা হতো – সম্পর্কটা এরকম ছিল। বীরেন দাশ শর্মা ম্যুভিয়ানার একটা কর্মশালাও করিয়েছেন। ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি এবং শিল্পকলা একাডেমি আমাদের এ উৎসবে সোহযোগিতা করছে। 

উৎসবের পরের দিনের আয়োজনে আছে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। বিজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা ‘তারেক মাসুদ ইয়ং ফিল্মমেকার অ্যাওয়ার্ড’ পাবেন। এছাড়া প্রথম ছয়টি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে তিন জন বাংলাদেশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট এবং বাকি তিনজন ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি আয়োজিত চলচ্চিত্র বিষয়ক কর্মশালার শিক্ষাবৃত্তি পাবেন।  এ বছর ‘ন্যায়বিচার আমার অধিকার’ চলচ্চিত্র নির্মাণের বিষয় ছিল।

প্রতিযোগিতায় বিষয় নির্ধারণ এর ব্যাপারটা কি কখনো নির্মাতার ভাবনাকে বেঁধে দিতে পারে বলে মনে হয় ?

যদিও বিষয় আমরা দিচ্ছি কিন্তু সৃজনশীলভাবে প্রতি নির্মাতা নিজের মতোন করেই দেখেন, নিজের মতোন করেই বানান। আর তারেক মাসুদ-এর ভাবনা এবং তাঁর দর্শন থেকেই বিষয় খুঁজে নিতে চাই আমরা। শেকড়, মুক্তিযুদ্ধ, ন্যায় বিচার সমস্ত তারেক এর কাজে দেখুন খুঁজে পাবেন।

মুক্তির গান এর পেছনের গল্প বই আকারে লেখার কথা ভেবেছেন কখনো?

একটা লেখা বেশ ক’দিন আগে লিখেছিলাম, দ্য মেকিং অব ‘মুক্তির গান’- শিরোনামে। বাংলায়ও অনুবাদ করা হয়েছিল বেশ কিছু পত্র-পত্রিকায়। আট-দশ পাতার ওটা। এক পর্যায়ে হয়তো বই আকারে লিখবো কিন্তু শুধু ‘মুক্তির গান’ এর গল্প নয়, আমার আর তারেকের চলচ্চিত্র যাত্রাটুকু লিখে রেখে যাবো হয়তো।

কাগজের ফুল এর কাজ কতদূর এগোলো? বা অন্য কোন চিত্রনাট্য নিয়ে ভাবছেন কি?

‘কাগজের ফুল’ অনেক বড় কাজ, এ চলচ্চিত্রের প্রস্তুতির জন্য সময়ের প্রয়োজন আছে। প্রামাণ্যচিত্র বেশ কয়েকটা করার পরিকল্পনা আছে, কাজ চলছেও। কিন্তু ফিচার ফিল্ম করার জন্য যে বাজেট প্রয়োজন তা আমাদের হাতে নেই, অনেকে বোঝেন না। কাগজের ফুল- বিশাল বাজেটের ছবি।

বর্তমান চলচ্চিত্র অঙ্গন সম্পর্কে বলতে বললে কী বলবেন?

যখন উৎসব করি দেখিতো, শুধু ঢাকা নয় মফস্বল শহরগুলো থেকে দারুণ প্রতিভারা উঠে আসছে। আমি আশাবাদী ওদের নিয়ে।

তারেক মাসুদ যে দর্শন ধারণ করে চলচ্চিত্র বানিয়েছেন আজ কারও কাজ দেখে কি মনে হয় সেই ভাবনা কেউ ধারণ করছেন?

একদিকে মেকিং এর ক্ষেত্রে একটা ভাবনা ছিল তাঁর। অনেকের কাজে এটা প্রভাব ফেলেছে তা আমি বুঝি। কিন্তু মেকিংয়ের পাশাপাশি ওর মধ্যে আরেকটা যে ভাবনা ছিল; আমি শুধু মেকার না আমাকে বের হতে হবে, আমাকে চলচ্চিত্র নিয়ে মানুষের কাছে যেতে হবে – এই উদ্যোগটা আমি দেখতে পাই না। তবু প্রসূন রহমান যে কাজ (‘সুতপার ঠিকানা’) করেছে সেটা নিয়ে সে কয়েক জায়গায় গিয়েছে দেখলাম। দেখুন আমাদের হলগুলোর যে দুরাবস্থা এখান থেকে বের হওয়ার এক পথ হিসেবেই কিন্তু তারেক এ কাজটা করতো। এছাড়া আমাদের তো ইতিহাস আছে এর পেছনে। এই যে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে তখন তো প্রত্যন্ত অঞ্চলে অঞ্চলে ঘোরা হয়েছে। এমন কি ‘মুক্তির গান’ যেভাবে রিলিজ দিয়েছিলাম। আমরা ডিস্ট্রিবিউটর, আমরাই এক্সিকিউটর... টোটাল ফিল্ম মেকিং প্রসেসটার মধ্যে নিজেকে ইনভল্ভ করা– এই ফিলোসোফি সবার মধ্যে পাওয়া যাবে না। এটা হতে পারে, কাজটা তো কষ্টসাধ্যও তাইনা? কিন্তু আমাদের দেশের যে অবস্থা এখানে আমরা যদি আমাদের সিনেমা দর্শকের কাছে পৌঁছোতে চাই তাহলে আমাকে তার কাছে যেতেই হবে সিনেমা নিয়ে। এখন ইউটিউব বা ইন্টারনেটের অন্যান্য ওয়েবসাইটে দেওয়া যায় কিন্তু তাতে তো ঐ যে বড় স্ক্রিনে চলচ্চিত্র দেখা সেই মনোযোগ তো আর পাওয়া যাচ্ছে না। এই অভ্যাসের তো দরকার আছে, বড় পর্দায় সিনেমা দেখার অভ্যেসটাই হারিয়ে যাচ্ছে।

চলচ্চিত্র প্রশিক্ষণ বিষয়ক একাডেমির নেতিবাচক দিক আর ইতিবাচক দিক?

বাংলাদেশে স্কিল ডেভেলপমেন্টের সুযোগের অভাব ছিল সবসময়, এমনকি এই যে সিনেমার ইতিহাস জানা, আমরা কোথায় আছি। আমরা কতটুকুর অংশ এটুকু জানার দরকার আছে। বাইরের দেশের সাথে তুলনা করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা এসবও দরকারী। কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখা জরুরী ফিল্ম নিয়ে রিসার্চ আর ফিল্ম মেকিং দুটি ভিন্ন দিক। এবং দুটো দিকই থাকতে হবে, থাকা জরুরী।

সাহিত্য থেকে বা অন্য মাধ্যম থেকেও যদি ধরি চলচ্চিত্রে গ্রহণের ব্যাপারে কী ভাবেন ?

সত্যজিৎ রায় – ও তো এডাপটেশনের মাধ্যমে কাজ করেছেন। যে কেউ করতে পারেন। আমরা অবশ্য এডাপটেশন এর মাধ্যমে কোন কাজ করিনি। এখানে বাংলাদেশে সমস্যা হল কোথাও এ জিনিস নেই যে আমরা একজন আরেকজনকে সম্মান করবো। আমরা শিল্পী হয়েও যদি অন্য শিল্পীর কাজের সম্মান না দেই তাহলে আমরা নিজেদের কাজেরও কিন্তু সম্মান দিচ্ছি না আসলে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছে কলকাতায়, কলকাতারটা বাংলাদেশে, বিষয়গুলোকে কী ভাবে দেখছেন?

এটা ইতিবাচক যদি সত্যিকার অর্থেই এক ধরণের আদান-প্রদান হয়। যেহেতু ভারতীয় চলচ্চিত্রের শিল্পীরা অনেকে এখানে আগে থেকে পরিচিত, আমাদের শিল্পীরা হয়তো তুলনামূলক কম পরিচিত। কিন্তু এ পরিচিতি বৃদ্ধি পাবে, আরও বেশি চলচ্চিত্র যাবে। তখন পরিচিতিও বাড়বে। আমরা একটু দূর্বল জায়গা থেকে শুরু করছি, ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে, সময় লাগবে একটু।

তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রতি কিছু কী বলতে চাইছেন আজ?

এইতো! একটু সাহস থাকতে হবে। চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে হলে যেমন প্রতিভা থাকতে হয় তেমন সাহসও থাকতে হয়। ভয় করো না, অনেক কিছু করা যাবে। অনেক ছোট ছোট জিনিস থেকে বড় কিছু হয়।