আলেহান্দ্রো হোদোরৌস্কি

যদি আমি আগে নিজের নিরাময় না করি, তবে সমগ্র মানবতাকে সারিয়ে তুলতে পারবো না আলেহান্দ্রো হোদোরৌস্কি

 

[আলেহান্দ্রো হোদোরৌস্কি। জন্ম ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২৯ সালে, চিলিতে। তিনি একজন  চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী, সুরকার, কবি, কমিক লেখক, ঔপন্যাসিক, আধ্যাত্মিক গুরু আরো অনেক কিছু ।  তিনি  বিশ্বাস করেন ভালোবাসা ও ম্যাজিকে। তিনি শেষ যে সিনেমা বানিয়েছেন সেটার নাম এন্ডলেস পোয়েট্রি, এটা দ্য ড্যান্স অব রিয়েলিটির সিকোয়েল। এবং বলা যায় আত্মজৈবনিক। স্কাইপের মাধ্যমে ৮৮ বছর বয়স্ক এই মানুষটির একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন কার্ল স্মিথ নামের আমেরিকান একজন সাংবাদিক। আর সেটা ‘দ্য কুইটাস ডট কমে’ প্রকাশ হয়েছিলো ৭ জুন ২০১৫ সালে। সেইদিন তিনি  তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন মিথের সামাজিক তাৎপর্য, পুঁজিবাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও জীবাশ্ম, জ্বালানি নিষ্কাশন, টুইটারের শিল্প আর নিজেকে ও বিশ্বকে সুস্থ করার তার আজীবনের লক্ষ্য নিয়ে। সেই সাক্ষাৎকারটিই কথাবলির পাঠকদের জন্য সম্পাদনা ও ভাষান্তর করেছেন কবি, গল্পকার ও অনুবাদক শিমুল ভট্টাচার্য।]   

 

আপনার কাজের প্রসঙ্গ, বই, চলচ্চিত্র আর বৃহৎ সামাজিক ধারণাতে মিথ কতটুকু প্রয়োজন?

যারা সাইকোঅ্যানালিসিস, ফ্রয়েদ, য়ুং পড়েছেন, তারা জানেন যে আমাদের একটি সমষ্টিগত অচেতন (কালেক্টিভ আনকনসাস) আছে।  এই মিথগুলি এই অচেতনের ভেতরকার বিষয়কে যুক্তিসম্মত করে তোলার জন্য প্রয়োজন। ইতিহাসে অনেক মিথ আছে। আমেরিকা ছাড়া আমাদের আর সবারই মিথ আছে। আমেরিকায়, তোমাদের আছে সুপারম্যান। আমার জন্য প্রশ্ন হলো... মানবজাতির প্রথম ভাষা কী ছিলো, প্রথম মিথগুলিই বা কী? গিলগামেশ, এটাই সবচেয়ে পুরনো মিথ, না? আমি সবচেয়ে পুরনো মিথের খোঁজ করেছি এই জিজ্ঞাসা নিয়ে ‘প্রধান অনুসন্ধানটা কী?’ আর সবসময়ই প্রধান অনুসন্ধান হলো অমরত্ব। গিলগামেশ, সে অমর হতে চেয়েছিলো, মিথের প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে মৃত্যুকে পরাজিত করা আর তারপর অজ্ঞানতা কে পরাস্ত করা। কারণ, আমরা জানি না, আমরা কোথায় আছি, এই জগতকে আমরা জানি না। জীবন কি আমরা জানি না, জীবনের রহস্য জানি না – তুমি তো মানুষ তৈরি করতে পারো না। তুমি যৌনপদ্ধতিতে জীবগত উপায়ে শরীরী মানুষ উৎপাদন করতে পারো। কিন্তু আমরা সেই শ্রেষ্ঠ কর্ম সৃষ্টি করতে পারি না, তা হলো মানুষ। তা তুমি সৃষ্টি করতে পারো না।

 

তবে, মিথ আমাদেরকে আমরা কে কী তা বুঝতে সাহায্য করে, যেখানে আমাদের আসলে কোনো ধারনাই নেই?

হ্যাঁ সেটাই! আমি অনেক বছর ধরে ট্যারটকার্ড নিয়ে পড়াশোনা করেছি আর ওগুলি সত্যিই মিথের এনসাইক্লোপিডিয়া।

 

ল্যান্ডস্কেপ, ভূগোল, আবহাওয়া, জ্যোতির্বিজ্ঞান, এগুলিকে ব্যাখ্যা করার জন্য মিথলজি একটি প্রয়োজনীয় যন্ত্র কিন্তু মিথ কীভাবে কাজ করে, কার্যকারিতা পরিপূর্ণ করে যখন সমাজের অংশ হিশেবে আমরা জানি যে মিথ সত্যি নয়?

জ্ঞান অর্জনের জন্য আমাদের মিথ পড়তে হবে। একজন সাধারণ লোক একটা জন্তু বা গাছের মতো বেঁচে আছে আর আমরা যদি উন্নতি চাই, ভেতর থেকে বড় হতে চাই, আমাদের মিথ প্রয়োজন; পুরাতনের জ্ঞান, ঐতিহ্যগত জ্ঞান প্রয়োজন। যা কিছু হারিয়ে গেছে এই জ্ঞানগুলি তারই সন্ধান করছে – এলকেমি এটা খুঁজেছে, ম্যাজিক এটা খুঁজেছে, ধর্ম এটা খুঁজেছে।  ‘এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র কোথায়?’ ‘আমি কেমন করে সেই কেন্দ্র খুঁজে পাবো?” কেউ কেউ বলে হৃদয়ই হচ্ছে কেন্দ্র। আর হৃদয়ের এই কেন্দ্র হচ্ছে ভালোবাসা।  ভালোবাসা সুন্দর।  আমরা সত্য জানতে পারি না কিন্তু ভালোবাসা ও সুন্দরকে জানতে পারি।

 

তবে সবকিছুই কি ভালোবাসার দিকে ফিরে আসে?

হ্যাঁ, তবে এই ভালোবাসা একজন ব্যক্তি বা ছোট্ট পশুকে ভালোবাসা নয়। না। এটা একটা বিশ্বজনীন সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা। ভালোবাসা একটা ধর্ম, এটা এক পুনর্মিলন । অন্যের সঙ্গে পুনর্মিলন, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, সমস্তকিছুর সঙ্গে পুনর্মিলন। তাই না? এই সামগ্রিকতার প্রতিটি অংশের একটা কেন্দ্র আছে এবং তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব কেন্দ্র খুঁজে পাবার প্রয়োজন আছে, আর এখন তোমার কাছে আমার প্রশ্ন হলো, ‘তোমার কেন্দ্রটা কী ?’

 

হয়তো কখনো আমি এর উত্তর দিতে পারবো ধরে নিচ্ছি আপনি যেমন করেন...

এটা হৃদয়ে। আর তোমার হৃদয়ের কাছে পৌঁছাতে হলে তোমাকে শব্দের ভেতর, ভাষার ভেতর, ভাষার অতলে গিয়ে কাজ করতে হবে- এখানেই আছে অনূভুতি। কারণ, ভাষা তো অনূভুতি না, এটা সত্য না। এটা একটা মুখোশ মাত্র। তা উপযোগী বিষয়, কিন্তু মূল বিষয় না।

 

চলচ্চিত্রর জন্যও কি এটা এভাবেই কাজ করে?

হ্যাঁ, সত্যিকারের চলচ্চিত্রর জন্য। ব্যবসায়িক চলচ্চিত্রর জন্য নয়। ব্যবসায়িক চলচ্চিত্র হচ্ছে সিগারেটের সঙ্গে সম্পর্কের মতোই, জানো তো? এটা তোমাকে ভালোবাসে কিন্তু মেরে ফেলে। এই চলচ্চিত্র তোমাকে মারে না কিন্তু তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টাও করে না; তুমি আয়েশ করো, চলচ্চিত্র উপভোগ করো, কিন্তু ওটা যখন শেষ হচ্ছে, তোমার পরিবর্তন হয় না, তোমার একটুও উন্নতি হয় না। তুমি একইরকম থেকে যাচ্ছো। তুমি কেবল তোমার কাছ থেকে পালিয়ে ছিলে। কিন্তু সত্যিকারের শিল্প মানে তোমার নিজের থেকে পালানো নয়, তা হচ্ছে তোমার নিজের ভেতর যাত্রা, নিজেকে স্মরণ করা। এটাই সত্যিকারের শিল্প।

 

তবে আপনার কাজের মাধ্যমে আপনি অন্য মানুষের জন্য এই কাজগুলিই করার চেষ্টা করছেন? আপনার চলচ্চিত্র, আপনার বইয়ের মাধ্যমে... 

হ্যাঁ। আমার কাজে, তার মধ্যে আমি যা করি তাকে আমি বলি থেরাপিউটিক আর্ট। শিল্প যদি কাউকে সারিয়ে না তোলে , তবে সেটা কোনো শিল্প না।

 

এমনটাই ফ্রয়েদ শিল্প নিয়ে, উদগতি নিয়ে বলেছেন যা সৃষ্টিকারীর চেয়েও দর্শকের জন্যই বেশি দরকার

হ্যাঁ, কিন্তু, ফ্রয়েদ তো শিল্পী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞানী। ফ্রয়েদ কেবল শব্দ দিয়ে, কথা বলা দিয়ে কাজ করতেন। কথা বলা তো নিরাময় করতে পারে না।

 

তবে, আপনি যখন একটা চলচ্চিত্র তৈরি করছেন বা বই লিখছেন, আপনি সেটা অন্য লোকের জন্য করছেন নাকি নিজের জন্য?

প্রথমত নিজের জন্য, দ্বিতীয়ত অভিনেতাদের জন্য, তৃতীয়ত সাধারণ মানুষের জন্য।

 

তো আপনি যতটুকু মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন, ততটুকু নিজেকেও নিরাময় করছেন?

সারাজীবন, জীবনের শেষপর্যন্ত আমি নিজেকে নিরাময় করার চেষ্টা করে যাবো। কেনো? কারণ, যদি আমি নিজের নিরাময় না করি তবে সমগ্র মানবতাকে সারিয়ে তুলতে পারবো না এবং যদি না সব লোক সেরে ওঠে তবে  আমি নিজের নিরাময় করতে পারবো না।  মানবতা—এই পৃথিবীতে, আমরা মরণশীল। কিন্তু মানবতা, আমরা এই মহাবিশ্বর বিলুপ্তি হওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারি, আমরা অমর হতে পারি, আমাদের সেই সুযোগ আছে। আর একটা সমাজ হিসেবে আমরা একা নই- শরীর হিসেবে আমরা শুধু একজন কিন্তু মানস প্রকৃতিতে আমরা অনেক, অনেকগুলি আত্মা- এটা একটা গোষ্ঠী।

 

আপনি একটু আগে যেমন কালেক্টিভ আনকনসাস নিয়ে বলছিলেন, তাই বলছেন এখন?

হ্যাঁ। আমি এতে বিশ্বাস করি, কিন্তু শুধু অচেতন নয়, আত্মচেতনেও। মেধা, ধারণা এগুলি ব্যক্তিগত নয়, আমরা ধারণাগুলি গ্রহণ করি, সৃষ্টি করি না।

 

তবে কি আপনি একজন অ্যান্টেনা?

হ্যাঁ, যারা এই জগতে প্রতি মুহূর্তে বসবাস করছে, তাদের সবার কাছ থেকে এই ধারনাগুলি আসে। তুমি একে ঈশ্বর বলতে পারো- ঈশ্বর কী? এটা একটা শক্তি, এটা এক রহস্য। সবকিছুই আমদের দেয়া হয়েছে। এমনকি ভালোবাসাও, সেটা আমদের না, জগতের কাছ থেকে আসছে। আমরা সৃষ্টি করতে পারি না। আমরা রূপান্তর করতে পারি। আমরা রূপান্তরকারী।

 

তবে আপনার মতে, শিল্পীরা একদমই স্রষ্টা নয়?

একজন শিল্পী কী খুঁজছে? আমাদের প্রতিদিনকার জীবনকে একটা কল্পনাপূর্ণ জীবনে রূপান্তর করার উপায় খুঁজছে। একজন শিল্পী অন্যদের দেখাতে চায় যে তারা কারা। আমরা দুজন কোনো রোমান্টিক প্রেম নিয়ে আলাপ করার মতো নির্বোধ নই।   আমরা এর চেয়ে বেশি কিছু। আমরা প্রত্যেকেই একেকজন অবিশ্বাস্য শিল্পকর্ম। এবং এটাকে প্রকাশ করার জন্যই রয়েছে শিল্প।

 

একভাবে, তবে আমরা নিজেরাই নিজেদের মিথ? আমাদের যে নিজস্ব উপায়ে নিজেদের এবং অন্যদের বুঝি?

আমাদের একটা শক্তি আছে। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি আছে, আমাদের একধরনের কামজ সৃজনশীলতা আছে, উপলব্ধি করার জন্য আমাদের একসঙ্গে কিছু করার দরকার হ্য়; আমাদের একত্রিত হয়ে ভাবতে হয়; একসঙ্গে ভালোবাসতে হয়; একসঙ্গে সৃষ্টি করতে হয়; একসঙ্গে কাজ করতে হয়। কিন্তু পারমাণবিক বোমা বানাতে নয়। যদি তা করি তা হবে ধ্বংস। আমরা এটা করতে পারি। আমরা সহযোগিতা করতে পারি। তবে সেটা হতে পারে নির্মাণ। আমরা স্বর্গে যেতে পারি। আমরা পারি।

 

তারমানে, আমরা সৃষ্টি করতে পারি না কিন্তু ধ্বংস করতে পারি? যা একেবারেই সুন্দর না...

আমরা ধ্বংস করছি। এই গ্রহকে আমরা ধ্বংস করছি। আমরা এক নির্বোধ সময়ে বাস করছি। আমরা অন্য ধরনের এক শক্তি নিয়ে বাঁচতে পারি- যে শক্তি বায়ুমণ্ডলকে ধ্বংস করছে সে শক্তি নয়। বোকার দল! আমরা সেই মাছেদের মতো যারা সাগরে বিষ মিশিয়ে দেয়।

 

আমাদের হাতে বিকল্প আছে

আমাদের কাছে বিকল্প আছে আর শিল্পকারখানাগুলির বোকামির জন্য আমরা এখন নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করার বিপদে আছি—টাকা বানানো, তাদের বড় হবার চিন্তা, পেট্রোলিয়াম খুঁজে পৃথিবীকে ধ্বংস করা, এগুলি সব বোকামি। তারা মূর্খ। পৃথিবীতে কোনো দেশ নেই, দেশগুলি আমরা আবিস্কার করেছি। এগুলি সত্যি নয়।

 

আপনার কথায়  মানুষ স্রষ্টা নয়, আপনি কি মনে করেন, প্রজাতি হিশেবে আমাদের ধ্বংসের দিকে যাবার একটা তাড়না আছে, কেননা, এটা এমন একটা ব্যাপার যা আমরা করতে পারি?

আমার মনে হয়, যাদের টাকার বেশি দরকার এটা তাদের ব্যবসা। ঈশ্বরের টাকার দরকার হয় না। ঈশ্বর টাকা নয়। তারা মনে করে টাকা একটা পবিত্র কিছু, কিন্তু এটা একটা দানব। এটা সম্ভব নয়। আমাদের অন্য এক ধরনের একতাসহ অন্য এক রকম সমাজের প্রয়োজন। প্রথমে আমাদের যেটা করা দরকার তা হচ্ছে টাকাকে পরিবর্তন করা। গুটিকয়েক মানুষের অনেক আছে আর অনেক মানুষের আছে সামান্য কিছু- সম্ভব নয়। বোকার দল! আমরা ধ্বংসের দিকে এগুচ্ছি।

 

এর থেকে এটা পরিস্কার মনে হয় যে আমাদের আসন্ন ধ্বংসের জন্য কারা দায়ী, এটা দেখানোর এখনই ভালো সময় যে আপনার বই যখন ভালোবাসার নিয়ে কথা বলে, তেমন এটা ক্ষমা নিয়ে কথা বলে

হ্যাঁ অবশ্যই। মানবজাতি, সে সবসময় মানব ছিলো না। আমরা বানর ছিলাম এবং আমরা বাড়ছি, আমরা বাড়ছি, আমরা বাড়ছি আর আমরা নিখুঁত নই—আমরা বদলাচ্ছি। এমনকি আমাদের শরীরও বদলে যাচ্ছে। আরো দুশো বছরে বা তারও পরে আমরা আর শাদা, কালো, হলুদ, লাল মানুষ থাকবো না, আমরা একই ধরনের মানুষ হবো। সবাই মিলে যাবো। আর তখন আমাদের নতুন কিছু ক্ষমতা হবে। আমরা মনযোগাযোগ করতে পারবো। ভাষা ফুরিয়ে যাবে। আমরা মধ্যাকর্ষণ হারিয়ে ফেলবো, একটা দ্বিতীয় মধ্যাকর্ষণবিরুদ্ধ সভ্যতা হবে। তখনও আমাদের শরীর থাকবে কিন্তু ওগুলি পরিবর্তন হবে।

 

টেলিপ্যাথি বা মনযোগাযোগ, মধ্যাকর্ষণ-বিরোধ... এগুলি সুন্দর করে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে উপন্যাসের ধ্রুপদী যাদু-বাস্তবতার দিকে যেটা আমার মনে হচ্ছে মিথলজি থেকে প্রাকৃতিক অগ্রগতির মতো?

মিথলজির রহস্য হচ্ছে মিথলজি লোককথা হয়ে যায়। আর এইসব যাদু মার্কেজের যাদু —মিথেরই একটা লোককথামূলক সংস্করণ। আমি নিজে মনে করি না এটা সেই অর্থে লোককথামূলক অথবা ম্যাজিকাল— আমি আসল যাদু নিয়ে লিখি যাদু-বাস্তবতা নিয়ে নয়।

 

যাদু বাস্তবতা যাদু-বাস্তবতার বিপরীত?

হ্যাঁ। কারণ আমার মতে, সত্যিকারের যাদু আছে সবখানে কিন্তু আমরা জানি না কী করে তা দেখতে হয়। এই জগতের যাদুটা চিনতে হলে আমাদের শেখার দরকার হয়। প্রতি মুহূর্তে ম্যাজিকাল কিছু একটা হয়।

 

ঐতিহ্য, লোককথা এবং যাদু সব কিছু একসঙ্গে বাঁধা, কিন্তু এর মধ্যে টুইটার বা এসবের মতো প্রযুক্তি কোথায় খাটে?

টুইটার আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমদিকে আমি ভাবতাম এটা একটা বোকা ব্যাপার যেখানে লোকজন বলছে তারা কী খাবার খেয়েছে বা বাথরুমে কখন মলত্যাগ করেছে—যোগাযোগ, তবে মূর্খ ধরনের যোগাযোগ। পরে, আমি বললাম, ‘না’, কেননা এটা একটা শিল্প—আজকের দিনের,  আমাদের দেশের সাহিত্য শিল্প। ‘কেনো?’ কারণ, তুমি ১৪০ অক্ষরে ছোট হয়ে গেছো, আর সেখানে তুমি শিল্প, দর্শন, বিজ্ঞান, কবিতা এগুলি নিয়ে সংক্ষিপ্ত করে বলতে পারো। প্রতিদিন আমি ১৫ টা টুইট করি। প্রতিদিন দুপুর একটা বাজে আমি এটা করার জন্য আধঘন্টা সময় নিই, একঘন্টা- আধঘন্টা। এক মিলিয়নের বেশি মানুষ আমাকে ফলো করছে—কিন্তু সবসময়ই ব্যক্তিগত ব্যাপার বাদ দিয়ে বলি। সৃষ্টিকর্ম, সাহায্য করা এসব নিয়ে বলি। ইন্টারনেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটা বিপদজনক যদি তুমি খারাপভাবে ব্যবহার করো। ক্ষতিকর বিজ্ঞান দিয়ে তুমি পারমাণবিক বোমা বানাও। ভালো বিজ্ঞান দিয়ে তোমরা বিস্ময় ঘটাতে পারো। আমি একজন ডাক্তারকে চিনি, তিনি চীনে থাকেন কিন্তু প্যারিসে থাকা এক ভদ্রলোকের হার্ট অপারেশন করেছেন। তোমরা এটা করতে পারো। দূরত্বে থেকেও তুমি কাজ করতে পারো।

 

এটা খুবই চমৎকার

আহ! এটাও চমৎকার যে তুমি এখন আমার সঙ্গে কথা বলছো। তুমি তোমার সুন্দর দাড়ি নিয়ে ওখানে অসে আছো আবার এখানে আমার সঙ্গেও আছো! এটা কী করে হচ্ছে? আমরা যা দেখি তাই বাস্তবতা নয়, তুমি আর আমি এখন কথা বলতে পারছি, আমরা এখন বাতাসে। আমরা পৃথিবীর সমস্ত মানবতার সঙ্গে যোগাযোগ করছি।

 

যোগাযোগের দিক থেকে, একটা বই লেখা, উপন্যাস লেখাকে কীভাবে একটা চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে তুলনা করা হয়?

এটা ভিন্ন। কিন্তু আমাদের সভ্যতা দেখে মনে হয় আমাদের কেবল একটা কিছু হবার ক্ষমতা আছে—তুমি একজন লেখক বা চিত্রশিল্পী বা তুমি একজন ফুটবল খেলোয়ার বা তুমি একজন সৈনিক- কিন্তু আমরা অনেক কিছুই। ধরো (তিনি তার ফোনটা হাতে নিয়ে), এটা আজকে একটা ফোন কিন্তু এটা একটা টেলিভিশনও, আবার মিউজিক প্লেয়ারও, এটা অনেক কিছুই হতে পারে শুধু একটা জিনিস নয়। এটার একটা কম্পন আছে, এই ফোন দিয়ে আমি মাস্টারবেট করতে পারি। মানুষও এই রকম। তুমি একটা কিছু নও, তুমি অনেক কিছু। যখন এই যন্ত্র গান শোনার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন এটা একটা যন্ত্র, যখন এটা টুইট করছে তখন আরেকটা যন্ত্র। যখন আমি ছবি বানাচ্ছি, তখন আমি এক ব্যক্তি, যখন বই লিখছি তখন অন্য ব্যক্তি। কিন্তু যাই হোক শিল্পীত ভাবে কিছু সৃষ্টি করার চাপ একই রকম কিন্তু আত্মাটা তোমার এক রকম না, এটা অন্য রকম। চলচ্চিত্র নির্মাণ খুব বড় ব্যাপার। যতদূর তুমি কল্পনা করতে পারো, প্রতিটি চিত্র, প্রত্যকটা ব্যাপার নিয়ে তোমাকে হিসাব করতে হবে যে এটা তৈরি করতে কত টাকা লাগবে। সবসময় টাকাই ব্যাপার কারণ এটা খুব ব্যয়বহুল। লিখতে গেলে তুমি একা। কমিকস তৈরি করা অন্য ব্যাপার কারণ তোমরা দুজন আছো, একজন আমি আর একজন শিল্পী যে ড্রয়িং করছে। প্রত্যেক শিল্পের আলাদা পরিস্থিতি আছে। কিন্তু সেগুলি সবই গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই এখনও আমার ছবির প্রথম প্রদর্শন করি মিউজিয়ামে,  কারণ এটা একটা শিল্প। উপন্যাস লেখাও শিল্প। এটা পোলিস ইতিহাস না বা অপরাধ পছন্দ করে এমন লোকের জন্যও নয়। তোমাকে তোমার সামনে এনে দাঁড় করানোর জন্যই আমি উপন্যাস লিখেছি। তোমার নিজেকে স্মরণ করানোর জন্য। আমাদের সবারই পারিবারিক জটিলতা আছে আর সবচেয়ে বোকা লোকটার আছে  উপন্যাস।

 

আপনি যখন কমিকস নিয়ে একজন শিল্পীর সঙ্গে কাজ করছেন এবং যদি আমরা সবাই গ্রাহক হই, সমন্বয়ের কারণে এই প্রক্রিয়াটা কতটুকু কঠিন হয়? নাকি আপনি যেই সমন্বয়সাধন করতে চাচ্ছেন তার কাছাকাছি যাবার জন্য এটাই সবচেয়ে বিশুদ্ধ বিন্যাস?

হ্যাঁ। কিন্তু কবিতায় তুমি একা—একা একা একা! তুমি কবিতা লিখছো তুমি কে তা আবিস্কারের জন্য, তাই না? আর তারপর একজন কবির মতো আমি স্ক্রিপ্ট লিখি আর আমি একটা ছবি তৈরি করতে থাকি কিন্তু একটা ছবি বানানো মানে একটা দলে কাজ করা। সেখানে দুইতিনশো লোক আছে, অভিনেতা, চিত্রকর, নৃত্যশিল্পী, কোরিওগ্রাফার, সুরকার এটা একটা বিরাট সমন্বয় এবং সবারই কিছু অভিমত আছে। যদি তুমি শিল্পী হতে চাও তোমাকে খুব দৃঢ় হতে হবে। যখন আমি  ‘দ্য ড্যান্স অব রিয়েলিটি’ বানানোর চেষ্টা করছি, আমরা চিলিতে ছিলাম। আমি তাদের বললাম, ‘শোনো, তোমরা সকলে বিশ্বাস করবে যে চলচ্চিত্র কী আমি জানি না, কারণ তোমরা ভেবে নাও তোমরা তা জানো, ঠিক আছে? এটা কী আমি জানি না, কিন্তু আমি খুব ভালো করে জানি যে আমি কী চাই।’ তারপর আমি যা চাই সেইমত আমি করবো। কারণ আমি আমার আত্মাকে শান্ত করতে চাই, এগুলি আমি তাদের বলি আর এভাবেই করি । কিন্তু শিল্প মানে হচ্ছে একসঙ্গে থাকতে শেখা।

 

সমন্বয়ের ব্যাপার যতটুকু থাকে, আপনি সম্পূর্ণ একাত্নতার যতটুকু কাছাকাছি যেতে পারেন, উপন্যাসে রাব্বি (ইহুদি আইন ও ধর্মীয় নেতা) চরিত্র আংশিক সমষ্টিগত অচেতনতার আদর্শ রুপ, আংশিক ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে?

রাব্বি একটা প্রথা; তুমি যা ইতিহাসের মধ্যে হারিয়েছো সে সেটাই, তোমার সৃষ্টি। সব মানুষের মধ্যে রাব্বি আছে—সে হয়তো রাব্বি নয়, কিন্তু একজন ভেতরকার পথপ্রদর্শক আর তারপর তোমার খুঁজতে হবে তোমার অন্তরগত পথপ্রদর্শক কে? এটা কি কোনো উন্মাদনা? না । কল্পনা? কে তোমার ভেতর সেই খননকারীকে চালাচ্ছে? তোমার একজন পথপ্রদর্শক আছে। এই পথপ্রদর্শক কে? তোমার আত্মা। তোমার সত্যিকারের আত্মা। কারণ আমরা অহং-এর ভাবনা নিয়ে দিন যাপন করছি। যে অহং আমাদের এখন আছে , তা পরিবার, সমাজ এবং ইতিহাস দিয়ে তৈরি  হয়েছে। এটা জটিল।

 

তবে আমরা কীভাবে আমাদের আসল সত্তাকে জানতে পারবো?

আমি নিজে আত্মাকে জানতে পেরেছি কষ্ট ভোগের মধ্যে দিয়ে। কারণ তুমি নিজে নিজের কাছে আসার জন্য যখন অনেক কিছু হারাতে শুরু করো তুমি তখন কষ্ট ভোগ করো। আর জীবনও এটা তোমার ওপর আরোপ করে। তুমি ভালোবাসায় ব্যর্থ হও, কাজে ব্যর্থ হও, একজনকে ভালোবাসো সে মারা যায়, তোমার অসুখ আছে, এখানে অনেকগুলি ভোগান্তি। এই ভোগান্তিগুলি মোকাবেলা করেও ধ্বংস না হওয়াটাই সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়।

 

 

Image result for alejandro jodorowsky movies

এন্ডলেস  পোয়েট্রি থেকে