আব্বাস কিয়ারোস্তামি

সিনেমাতো আসলে বক্তব্য প্রচারের জায়গা না আব্বাস কিয়ারোস্তামি

[আব্বাস কিয়ারোস্তামি। ইরানি সিনেমা পরিচালক। প্রথমে ভেবেছিলেন শিল্পী হবেন। পরে সিনেমাজগতে ঢুকে পড়েন।যুক্ত হয়ে পড়েন ইরানি নিউওয়েভ, পার্সি সিনে মা-এধরণের সিনেমা আন্দোলনের সাথে।সৃষ্টি করেছেন টেস্ট অব চেরি, উইন্ড উইল ক্যারি আস, এন্ড লাইফ গোজ অন, ক্লোজ আপ, থ্রো দ্য অলিভ ট্রি ইত্যাদি ছবি। যেখানে পার্সি কবিতার আবহ-দর্শনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে মিশে গেছে প্রত্যন্ত ইরান, ইরানের জীবন।তারপর ছড়িয়ে গেছে সারা বিশ্বে। ফলে আলাদা হয়ে গেছেন আব্বাস। আব্বাসের নিজস্ব স্বর। আমরা শুনলেই বুঝি। শাহীন পারহামির নেয়া একটি সাক্ষাৎকার কথাবলি’তে পুনর্বার প্রকাশ করা হলো।। তিনিও সিনেমা পরিচালক। বিশেষ করে ইওর এবসেন্স(১৯৯৫), নেসাইন(২০০২)ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাজ। তিনি আব্বাস কিয়ারোস্তামির এ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মন্ট্রিয়ালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব চলচ্চিত্র উৎসবে, ২০০০ সালে। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন রাজীব দত্ত।]

আপনার সিনেমা বানানোর অভিজ্ঞতা দিয়েই শুরু করি। যেমন- ইরানি নিওওয়েভ ছবি কোয়েজার(১৯৬৯)এর টাইটেল ডিজাইনের সময় কী মাথায় ছিলো আপনার?

মোটেও কিছু মাথায় ছিল না।আমি তো প্রথম দিকে ছবি-টবি আঁকতাম। পরে কর্মাশিয়াল গ্রাফিক ডিজাইন শুরু করি।তো অই আভিজ্ঞতা দিয়েই শুরু বলা যায়। আর সল বাসের কাজতো এমনিতেই অসাধারণ। তার টাইটেল অই সময়কার গ্রাফিক ডিজাইনার-আর্টিস্টদের খুব প্রভাবিত করতো।আমার আগেই কিছু ৩৫মিমিতে কর্মাশিয়াল কাজের অভিজ্ঞতা ছিল।তাই আমিই তার সাথে কাজের সুযোগ পাই। তো সেদিক থেকে, একজন গ্রাফিক আর্টিস্ট হিসেবে কাজটা আমার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জের আবার পছন্দেরও ছিল।‘কোয়েজার’ ছিল আমার দ্বিতীয় ছবি। আমি ভেবেছিলাম, আগে ৪/৫ টা ছবির টাইটেল ডিজাইনের কাজের পর পরিচালনার দিকে যাবো।তাই বলা যায় এ ছবিটার টাইটেল ডিজাইনকে আমার গ্রাফিক ডিজাইন আর সিনেমার কাজের একটা যোগসূত্র বলা যেতে পারে।অই সময় আমার ডিজাইনের কাজের ধৈর্যটা তেমন ছিল না।আমার ভাবতে ভালো লাগতো, অন্য কেউ আমার ছবির টাইটেল ডিজাইন করছে।আর আমার মনে হতো, টাইটেল ডিজাইনের সব স্টাইলই হয়ে গেছে।নতুন কিছু নাই। 

ব্রেড এন্ড অ্যালে’র(১৯৭০)টেকনিক্যাল এবং নন্দনতাত্বিক দিক নিয়ে কিছু বলবেন?এ শর্ট ফিল্মটার স্ক্রিপ্ট আপনার ভাইয়ের লেখা, সিনেমার নির্মাণে এটারও কী কোনো ভূমিকা আছে?

হ্যাঁ, এ স্ক্রিপ্টটা আমার ভাইয়ের লেখা।ওই সময় মানে ৬০’র শেষে আমি তখন ইন্সটিটিউশন অব ইনটেলেকচুয়্যাল ডেভেলপমেন্ট অব চিল্ডড্রেন এন্ড ইয়াং এডাল্ট,এ কাজ করি।অনেকগুলো স্ক্রিপ্ট পড়ি।তার মধ্যে আমার ভাইয়েরটাই পছন্দ হয়। বিশেষ করে, এটার ডিউরেশনটা। গল্পটা ছিল প্রায় ২০মিনিটের মতো। তেমন বেশি বড় না।কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম না, গতানুগতিক কিছু বানাতে।তাই বাস্তবতা আর সিনেমাটিক টাইম, এ দুইটাকে মিশিয়ে দেওয়াটা আমার কাছে একটা চমৎকার চ্যালেঞ্জ ছিল।

এটা ছিল আমার প্রথম কাজ। তাই কঠিন ছিলো অনেক।আমাকে কাজ করতে হয়েছিলো একটা ছোট বাচ্চা, এটা কুকুর আর লোকজনের ভীড়ের মধ্যে। সিনেমাটোগ্রাফার যে ছিলো, সে তো পুরাটা সময় শুধু একটার পর একটা সমস্যা খুঁজে আনতো।তবে কাজ ভালো ছিল। কিন্তু সে যেভাবে কাজ করতে অভ্যস্ত। আমি ওইভাবে করছিলাম না। তার মতে, আমরা দৃশ্যগুলো ভেঙে ফেলছিলাম। সে চাচ্ছিলো বাচ্চাটা লঙশটে এবং তার হাতকে ক্লোজশটে নিতে। পরে বাচ্চাটা য়খন ঘরে ঢুকবে, দরজাটা, দরজার ওখানে শুয়ে থাকা কুকুরটা এসব অনেক ক্লোজশটে নিবে।কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম, বাচ্চাটা আর কুকুরটাকে এক টেকে নিতে।বাচ্চাটা ফ্রেমের ভেতর দিয়ে হেঁটে গিয়ে ঘরে ঢুকবে। আর কুকুরটা দরজার কাছে শুয়ে পড়বে।এতে দর্শকের উপর ইমপ্যাক্টটা বেশি পড়বে।

আমি ভেবেছিলাম, কষ্ট হলেও লঙশটই নেবো।অই বিশেষ শটগুলোর জন্য ৪০দিন অপেক্ষা করতে হলো, তিনবার কুকুর বদলাতে হলো(এর মধ্যে একটার জলাতঙ্কও ছিল)। এতসব সমস্যার পরও আমরা শেষ পর্যন্ত কাজটা শেষ করি।পরে দেখা গেলো আমি না বোঝার কারণে সিনেমাটা অনেক বড় হয়ে গেলো।এখন যখন সিনেমাটা নিয়ে ভাবি, বুঝি আমার সিদ্ধান্তই ঠিক ছিল।সিনেমার ছন্দ, বিষয়-বাস্তবতা এসবের ক্ষতির সম্ভাবনার পরও আমি দৃশ্যকে ভেঙ্গে ফেলতে পছন্দ করি।

সিনেমায় আপনার যে ন্যারেটিভ একটা ভঙ্গি, আঙ্গিক, এটা সময়ের সাথে কীভাবে বিকশিত করলেন?

আসলে এভাবে তো ভাবিনি।ভেবে বলতে পারলে ভালো হতো।তো, এই মুহুর্তে যেটা বলা যায়, যা করেছি তা একধরণের ভয় থেকে হয়েছে।ভয় মানে, টেকনিক্যাল কিছুই জানা-বোঝা ছাড়া যখন ক্যামেরা-সেটের সামনে দাঁড়িয়েছি, আমি নিজেই নিজের কাছে চ্যালেঞ্জে পড়ে গেছি।আর এই চ্যালেঞ্জ থেকেই একটু একটু করে এগিয়েছি।

কাজ করার পর, যখন একজন দর্শক হিসেবে দেখেছি, নিজের সামর্থের কথা ভেবেছি, তখন হয়তো মনে হযেছে কিছু একটা করেছি। আমি মনে করি না, ক্যামেরায় চোখ রাখার আগে কেউ ঠিক করে রাখতে পারবে, আমি এই স্টাইলেই কাজ করবো।এটা সম্ভব না।আর রিদম নিয়ে বললে, কর্মাশিয়াল ছবির যে গতি- উত্তেজনা, আমি কখনো এর ভক্ত হতে পারি নি।কারণ, আমার মধ্যে ‘ফাস্ট’ এ প্রবণতাটা নাই। আমি সবসময় একটু স্লো, আমার ছবিও তা-ই।

আপনার ছবিতে মিউজিক বা আবহ-সংগীত কোন সময় ঠিক করেন?এডিটিংযের সময়, নাকি আগেই?

এডিটিংয়ের সময় আবহ-সংগীত নিযে ভাবি না। আগেই ঠিক করে ফেলি।দরকার হলে এক-আধটু চেঞ্জ করি বড়জোড়।

মিউজিকও?

হ্যাঁ মিউজিকও। আমিতো অইরকম কোনো সাউন্ডট্র্যাক ইউজ করি না। করলেও ছবির শেষের দিকে।তখন কোন বাদ্যযন্ত্রটা নিবো, তা আগেই ভেবে রাখি। যদি কোনো মিউজিশানের সাথে কাজ করি, তবে তার হাতে সিনেমাটা ছেড়ে দিই না।ছেড়ে দিলে এটা মেইলে বিয়ের মতো হয়ে যায়। রিস্কি।যেখানে সাউন্ড একটু এডিট করলেই মনে হয়, বুঝি মাইক্রোফোনের উপর দিয়ে পলকা কোনো পাখি উড়ে গেছে! সেখানে নিজের আস্ত একটা ছবি, কীভাবে আরেকজনকে দিই!

আপনার সিনেমার একটা বৈশিষ্ট্য, একদম প্রথমদিকের ছবি ট্রাভেলার(১৯৭৪)এ দেখেছি- পর্দার বাইরের বিভিন্ন শব্দের চমৎকার ব্যবহার আছে। বিশেষ করে ডায়লগের সাথে সাথে মনোলগও এসেছে।আমার মনে হয়েছে, দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস, ছবিতে এই ভঙ্গিটা আরো বোল্ডলি এসেছে।এটা কি ছবিকে আরো ন্যারেটিভ করে তোলার স্বার্থে?

হ্যাঁ, এই উদ্দেশ্যেই করা। আমি মনে করি, আমরা যা দেখছি না, তারও ভালো একটা ইম্প্যাক্ট আমাদের উপর পড়ে। অনেকদিন থাকে।সিনেমায়, এটা দর্শকদের কল্পনাকে আরো বিস্তৃত করে দেয়।তারা পর্দায় চোখের সামনে যা দেখছে, শুধু শুনেই তারচে ভালো দেখে। এটা আসলে, দর্শকের আবিষ্কারের জন্যেই রাখা।

আমার তো ঈর্ষা লাগে, যখন দেখি কোনো লেখকের একটা উপন্যাস পড়তে গিয়ে কল্পনার করার বিশাল জগত পাওয়া যায়, যেটা সিনেমায় নাই।যদি এই উপন্যাসটার মতোই সিনেমাকেও গড়ে তোলা যেতো, চমৎকার হতো।ধরা যাক, একটা চ্যাপ্টারের শেষ চার লাইন একটা পৃষ্টার উপরে গিয়ে শেষ হলো, এবং বাকিটা খালি।এরপর অন্যপৃষ্টায় অন্য চ্যাপ্টার শুরু। ছোট শিরোনাম দিয়ে।এতে আপনি স্বস্থি পাবেন।চিন্তা করার সুযোগ পাবেন।আমাকে যখন কেউ বলে, বইটা হাতে নেয়ার পর শেষ না করে উঠতেই পারিনি; তখন আশ্চর্য লাগে।এই যে পাঠককে ধরে রাখো, এইটাতো একটা শিল্পকর্মের গুণ, না? আমাদের মূলধারার সিনেমাও একই রকম উত্তেজনার ভিতর দর্শক ধরে রাখে। আমি যখন আমার সিনেমা এডিট করতে যাই, উপন্যাসে খালি পৃষ্টা রাখার মতো আমিও চেষ্টা করি্ কোনো ইমেজের বদলে একটা কালো মার্জিনের মতো রাখি। এবং বলি- এটা এখনকার জন্য।

সিনেমাও শিল্পী এবং দর্শককে এই স্বাধীনতা দিতে পারে। যখন ‘দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস’ বানাচ্ছিলাম, আমি জানতাম একটা লোক বারবার পাহাড়ে উঠছে, এটা দেখতে অনেক বিরক্তিকর। কিন্তু আমি এ চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম- দর্শক বিরক্ত হোক। চরিত্রগুলোই অই ধরণের। বিরক্তিকর। কোনো কাহিনী নেই। শুধু নিত্য-নৈমিত্তিক কিছু বিষয় আর কিছু দৃশ্য। এইই। এমনকি, সিনেমার মূল চরিত্র যেটা, সে যেন কিছু একটা ঘটার অপেক্ষায় আছে। আসলে, এ যে কিছু না ঘটা, এতে দর্শকের একটা কৌতুহল তৈরি হচ্ছে। শেষের দিকে এসে যখন একজন মাটি চাপা পড়ার মতো ছোট ঘটনাটা ঘটলো, একট গল্প তৈরি হয়ে গেলো। অনেকসময়, উপন্যাসের আলাদা চ্যাপ্টার শুরুর মতো সিনেমায়ও দর্শকের জন্য কিছু খালি স্পেস রাথা লাগে, যাতে একটা  তৈরি হয়।

লেখকরা উপন্যাস লেখার সময় প্রথমে বেশ বড় করে শুরু করেন। কিন্তু পরে এটাকে আলাদা করে নতুন অধ্যায় শুরু করেন, যাতে পাঠকের পড়ায় ইচ্ছাটা বজায় থাকে, আস্তে আস্তে বাড়ে। কিন্তু প্রচলিত সিনেমা এ ঝুঁকিটা নিতে চায় না। অন্যভাবে বললে, এ ধরনের সিনেমা প্রচলিত-গৎবাঁধা-বক্তব্যধর্মী কাহিনী দেয় দর্শকদের। ফলে, তারা অন্যধরণের কিছুই নিতে পারে না।এ সিনেমার দর্শকরা অন্যধরণের সিনেমা দেখলেই বিরক্ত হয়, বিভ্রান্ত হয়। অনেক সময় তাদের বলতেও শোনা যায়, কী সিনেমা এটা, আগাও নাই-মাথাও নাই! কিন্তু আমি মনে করি, যদি তুমি কোন কারণে সিনেমাটা দেখতে না পারো(ধরো লোডশেডিংযের কারণে), তারপরও তুমি ধরতে পারবে। আসলে, সিনেমার প্রত্যেকটি দৃশ্যইতো স্বয়ংসম্পূর্ণ।আগে, যখন সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত হচ্ছিলাম, তখন সিনেমার কোনো একটা চমৎকার দৃশ্য দেখার পরই আমি হল থেকে বেরিয়ে আসতাম।অইসব দৃশ্যেই আমি মুগ্ধ হয়ে থাকতাম।আমার শেষ দেখার ইচ্ছাটা থাকতো না। কোনোরকম উপসংহার বা চরিত্রগুলোকে ভালো-মন্দ এরকম রায় দিয়ে দেয়া, এটা আমি মানতে পারতাম না।

অর্থাৎ, বক্তব্যধর্মী সিনেমা ঠিক আপনার পছন্দ না!

সিনেমাতো আসলে বক্তব্য প্রচারের জায়গা না। একজন শিল্পী একটা কিছু সৃষ্টি করেন তার চিন্তা-ভাবনা-অনুভুতিকে প্রকাশ করার জন্য।এখানে ফারসি কবি রুমি- হাফিজকে আমরা ধরি, তাদেরকে আপনি যেকোনো সময়-অবস্থানে বসেই পাঠ করতে পারেন। শুধুই সাহিত্যিক, এরকম কোনো গণ্ডিতে তারা আটকে নেই। এটা আমাদের এখনকার কবি ফরোহ্ ফারোখযাদের বেলায়ও সত্যি।

যখন আমরা কোনো বিমূর্ত ছবিকে আমরা আমাদের মতো করে পাঠ করতে পারি, অথবা সংগীত- আমরা হয়তো ঠিক অর্থটা বুঝি না, তারপরও আমরা শুনি, মুগ্ধ হই।কিন্তু সিনেমার বেলায় অনেকেই এসে অর্থ খুঁজে, মানে খুঁজে। কিন্তু সিনেমাতো  আসলে একটা গান-একটা ছবি বা কবিতার মতোই!

আপনি যখন একজন লেখক, তখন আপনার এ সিনেমাকে আপনি কীভাবে দেখবেন? ধরেন, কেউ একজন আপনার ‘টেস্ট অব চেরি’র শুরুর দৃশ্যটাতে  যদি সমকামিতার কিছু পায়, আপনি কীভাবে নিবেন?

আব্বাস-আমি জানি, এ ছবিকে এরকম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হবে। যে কেউ তার মতো করে করে, আমার ছবিকে পাঠ করুক, এটা আমি চাই।মনে আছে,হোয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম(১৯৮৭) ছবিটা বানানোর পর একজন বলেছিল, তার কাছে সিনেমাটা প্রচণ্ড রাজনৈতিক মনে হয়েছে।যখন আমার বন্ধু তাকে কেনো জিজ্ঞেস করলো, সে বললো, মোহাম্মদ রেজা নেমাদজাদেহ্, এ নামটার জন্য। এ নামের প্রথম অংশটা একসময়ের ইরানের মোহাম্মদ রেজা পাহ্লভীর সাথে মিলে, তার পারিবারিক নামওতো নেমাদজাদেহ। এর অর্থ আল্লাহর দান।পরে জানলাম, লোকটা ইরানি টেলিভিশনের জন্য কাজ করতেন এবং বিপ্লবের সময় আগুনে পুড়ে মারা যান। এরকম একটা ছবি নিয়ে বিভিন্ন রকম দর্শকের কাছ থেকে, বিভিন্ন রকম ব্যাখা আসতেই পারে।তাদেরকে এ সিনেমা-পাঠ থেকে বঞ্চিত করার অধিকার আমাদের নাই।

আপনি  যখন আপনার আগের ছবিগুলো দেখেন কী মনে হয়? আপনার প্রথম ফিচার ম্যুভি ‘ট্রাভেলার’ নিয়ে কিছু বলবেন?

ছবিটাতো বানিয়েছিলাম প্রায় বিশ বছর আগে। কিছু দিন আগে জাপানের কিছু ফিল্ম ফেস্টিভালে দেখানোর সময় আবার দেখলাম। মনে হলো, এটা এখনও দেখার মতো। দর্শকও নিতে পারছে। কিন্তু আমার কোনো ছবিই আসলে ঠিক পারফেক্ট না। কিছু না কিছু সমস্যা আছেই।আর এটা শুধু আগের না, এখনকার ছবিগুলোতেও।কিন্তু সমস্যাগুলো বুঝেও ঠিক এড়াতে পারছি না। রয়েই যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রফেশনাল না এরকম অভিনেতাদের সাথে যখন কাজ করি, তার সাথে সার্বিক অবস্থা মিলিয়ে আর নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না।

এই অসন্তুষ্টিগুলোই পরে সিনেমার দোষ অথবা গুণ হিসেবে চোখে পড়ে।যদি ‘ট্রাভেলার’ সিনেমাটা এখন বানাতাম, অনেক কিছুই হয়তো শুধরে নিতে পারতাম, কিন্তু এটাও ঠিক, অনেক চমৎকার মুহুর্তই এতে হারিয়ে যেতো।আসলে যে ছবিগুলো আগে বানিয়েছি, অইগুলো আমার অতীত-সেই মুহুর্তগুলোকেই ধারণ করে আছে।

শিল্প-দর্শন-সমাজত্ত্ব ও রাজনীতি ইত্যাদি আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করে?

আব্বাস- যে কেউই যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে আসে, তার আগেই তার জানা-শোনাকে শরীরে মিশিয়ে নিয়ে তবেই আসে।সে যদি সত্যি সত্যিই তত্ব-দর্শন এসব বুঝে থাকে, তবে তার কাজে তা পানির মতোন মিশে থাকবে। ভেসে উ্ঠবে না।আর রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনার প্রতিক্রিয়াগুলো যখন খবরের কাগজ বা নিউজে মৃত ঘোষিত হয়, তখনই তা আস্তে আস্তে সিনেমায় ঢোকা শুরু করে।আর যদি এর উল্টোটা হয়, অর্থাৎ কোনোরকম পরিপাক হওয়া ছাড়াই যদি তা সিনেমায় চলে আসে তবে তা লিফলেট-শ্লোগান ছাড়া কিছুই হয় না।

আমি মনে করি শিল্প হবে সময়উন্মুক্ত। যেমন এই ইরানের কথা ধরো, এখানকার সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুগুলো মুহুর্তে মুহুর্তে বদলাচ্ছে।এখন এটা, আরেকটু পর আরেকটা। এখন শিল্পী যদি এই সময়টাকে ধরতে চায় অথবা ধরো, একদম মৌলিক যে বিষয়গুলো: যেমন মনুষ্যত্ব, মানবতা ইত্যাদির দিকে তাকায়, কোনটার আবেদন দীর্ঘস্থায়ী হবে?

অর্থাৎ, একজন শিল্পী অবচেতনভাবেই সমকালীন?

হ্যাঁ, এটাই। চব্বিশ ঘণ্টা খুঁজে নিউজ আনা, অইটা ছাপা, এসব সাংবাদিকদের কাজ, কিন্তু একজন শিল্পীর কাছে অই ঘটনাগুলোই সময় পার হয়ে আসে। সবসময়ের হয়ে।