সিমন দ্য বোভোয়ার

সার্ত্রে ভেবেছিলো জীবনটা শব্দের ফাঁদে ধরা পড়বে, আর আমি ভেবেছি শব্দেরা জীবন নয়, পুনর্জীবন সিমন দ্য বোভোয়ার

 

[সিমন দ্য বোভোয়ার ৯ জানুয়ারি, ১৯০৮ – ১৪ এপ্রিল, ১৯৮৬ একজন ফরাসি লেখক ও দার্শনিক। তিনি দর্শন, রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়াবলির ওপর রচনা, গ্রন্থ ও উপন্যাস এবং জীবনী ও আত্মজীবনী রচনা করেন। তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার উপন্যাস She Came to Stay এবং The Mandarins, এবং ১৯৪৯ সালে লেখা তার প্রবন্ধগ্রন্থ The Second Sex-এর জন্য। শেষোক্ত গ্রন্থটিতে নারীর ওপর নিপীড়নের বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং এটিকে নারীবাদের একটি অন্যতম ভিত্তিগ্রন্থ হিশেবে বিবেচনা করা হয়।

দ্য বোভোয়ার-এর এই সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয়েছিল তার স্টুডিওতে। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন মাদেলিন গোবেইল। এটির বানার্ড ফ্রিথম্যানকৃত ইংরিজি ভাষান্তর ছাপা হয়েছিলো ১৯৬৫ সালে ‘প্যারিস রিভিউ’র স্প্রিং-সামার সংখ্যায়। কথাবলির পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটিই ইংরিজি থেকে আংশিক ভাষান্তর করেছেন নীলাঞ্জনা অদিতি।]

 

গত সাতবছর যাবৎ আপনি আপনার জীবনস্মৃতি লিখছেন যেখানে ক্রমাগত আপনি আপনার ঝোঁক ও জীবিকা সম্পর্কে বিস্মিত হয়েছেন। আমার মনে হয়েছে এটা আপনার ধর্মীয় বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা যা আপনাকে লেখক হবার পথে এনেছে।

কারো অতীত ঘেঁটে দেখা খুব কঠিন যদি না সেখানে কিছুটা ভেজাল মিশে থাকে। আমার লেখার ইচ্ছা অনেক আগেই ছিল। আমি ৮ বছর বয়সে গল্প লিখেছিলাম, কিন্তু সেতো ওই বয়েসে অনেকেই করে থাকে। সেটা এটা বোঝায় না যে তাদের লেখার ঝোঁক ছিল। এটা হয়তো আমার ক্ষেত্রে এমন ছিল যে ঝোঁক কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কারণ আমি ধর্মীয় বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম এটাও সত্যি যে আমি যখন বই পড়ি সহজেই গভীরভাবে আবিষ্ট করে যেমন জর্জ ইলিয়টের ‘দ্য মিল অন দ্য ফ্লস’, আমি ভীষণভাবে তার মতো হতে চাইতাম, এমন কেউ যার বই পড়া হবে যার বই পাঠক কে আবিষ্ট করবে।

আপনি কি কখেনো ইংরেজি সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন?

ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি পড়া আমার  অন্যতম নেশা। ইংরেজি সাহিত্যের সম্ভার ফ্রেঞ্চ থেকেও মোহনীয়। আমার পড়তে ভাল লেগেছিল ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’, ‘পিটার প্যান’, জর্জ এলিয়ট, এমনকি রোজামন্ট লেহম্যান।

‘ডাস্টি অ্যান্সার’?

আমার সেই বইটার প্রতি সত্যি মুগ্ধতা ছিল। আর তবু এটা মধ্যম মানের। আমার প্রজন্মের মেয়েরা এটার গুণগ্রাহী ছিল। লেখক খুব অল্পবয়সী ছিলেন, আর সব মেয়েরা জুডির মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেত। বইটা চতুরভাবে লেখা, তবু জটিল ছিল। আমার জন্য আমি ইংরেজি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে হিংসা করতাম। আমি বাড়িতে থাকতাম। আমার নিজের কোনো রুম ছিল না। আসলে, আমার কিছুই ছিল না। আর যদিও সেই জীবন মুক্ত ছিল না, সেখানে একান্ত হবার অনুমতি ছিল আর এটা আমার কাছে খুব চমৎকার ব্যপার ছিল। লেখক কিশোরীদের সব মিথ জানতেন- সুদর্শন ছেলেরা রহস্য নিয়ে আসবে ইত্যাদি। পরে অবশ্য আমি ব্রন্টে পড়েছি আর ভার্জিনিয়া উলফ-এর বই ‘ওরলয়ান্ডো, মিসেস ডালওয়ে’, ‘দ্য ওয়েভস’ নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই কিন্তু আমার ওনার এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং-এর ওপর লেখা বইটা খুব প্রিয়।

তার প্রবন্ধ নিয়ে কী অভিমত?

এটা কম আগ্রহ জাগিয়েছে। এটা খুব তাত্ত্বিক। এটা চমৎকার কিন্তু আমার কাছে এটা বিদেশি। তিনি এই ব্যাপারেই বেশি ভাবতেন যে প্রকাশের পর লোকে তাকে নিয়ে কি বলবে।  আমার খুব ভাল লেগেছিল ‘আ রুম অব ওয়ানস ওন’ যেখানে তিনি নারীর অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন। এটা সংক্ষিপ্ত রচনা, কিন্তু এটা মস্তিস্কে পেরেক ঠোকার মতো। তিনি ভাল মতো বিধৃত করেছেন কেন নারীরা লিখতে পারেন না। ভার্জিনিয়া উলফ অন্যতম লেখিকা যার প্রতি আগ্রহ ছিল। আপনি কি তার কোন ছবি দেখেছেন? অনন্য সাধারণ নিঃসঙ্গ চেহারা... একভাবে তিনি কলেট-এর চেয়েও বেশি আগ্রহ জাগিয়েছেন । কলেট তার প্রেম, গৃহস্থালী কাজ  পোশাক ধয়া ইস্ত্রি করা ও শাবকদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। ভার্জিনিয়া উলফ এর চেয়েও বিশাল।

আপনি কি তার অনুবাদ পড়েছেন?

না, ইংরেজিতে। আমি ইংরেজি বলার চেয়ে ভাল লিখতে পারি।

লেখকের জন্য কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ব্যাপারে কি মনে করেন? আপনি নিজে সরবোন-এ মেধাবী ছাত্র ছিলেন আর লোকের প্রত্যাশা ছিল শিক্ষক হিশেবে দারুণ পেশা হবে আপনার।

আমার শিক্ষা আমাকে দর্শন সম্পর্কে ভাসা ভাসা ধারণা দিয়েছিল কিন্তু আগ্রহকে তীক্ষ্ম করেছিল। শিক্ষক হিশেবে আমার খুব সুবিধা হয়েছিল- সেটা এভাবে যে, অনেকটা সময় পড়া লেখা আর জ্ঞান অর্জনে ব্যয় করতে পেরেছি। সেসব দিনে শিক্ষকদের কোনো বড় মাপের কর্মসূচী ছিলনা। আমার শিক্ষা আমাকে শক্ত ভিত দিয়েছিল কারণ রাজ্য পরীক্ষায় পাশ করার জন্য আপনাকে সেই সব জায়গা আবিস্কার করতে হবে যা নিয়ে আগে ভাবতেন না আপনি যদি সাধারণ সংস্কৃতি নিয়ে ভাবেন। তারা কিছু শিক্ষামূলক নিয়ম সরবরাহ করেছিলেন যা ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ লেখার সম্নয় কাজে দিয়েছিল সাধারণ ভাবে সব শিক্ষার জন্যই। মানে বই খুব দ্রুত পড়ে যাওয়া , দেখা কোন কাজটা গুরুত্বপূর্ণ, শ্রেণিবিভাগ করা, যা গুরুত্ব রাখেনা তা বাদ দিতে পারা , সংক্ষেপিত করতে পারা, ঘাঁটা।

আপনি কি ভাল শিক্ষক ছিলেন?

আমার তা মনে হয়না, কারণ আমি শুধু মেধাবী ছাত্রদের প্রতি আগ্রহী ছিলাম আর বাকিদের প্রতি একদম ছিলাম না অথচ একজন ভাল শিক্ষকের সবার প্রতি আগ্রহী হওয়া উচিত। কিন্তু আপনি যদি দর্শন পড়ান আপনার কোন উপায় নেই। সবসময় ৪৫ জন ছাত্র থাকবে যারা কথা বলবে, আর অন্যরা কিছু গ্রাহ্য করবে না। আমি তাদের নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাইনি।

আপনার প্রকাশের দশ বছর আগে থেকেই আপনি লিখছেন। হতাশ হননি?

না, কারণ আমার সময়ে আপনি যখন খুব কম বয়সী তখন নিজেকে প্রকাশকরা অস্বাভাবিক ছিল। অবশ্যই দু একজন উদাহরণ ছিল, যেমন রেদিগ্যেট, যে ছিল একজন বিস্ময়। সার্ত্রে নিজেও ৩৫ বছর হবার আগে নিজেকে প্রকাশ করেননি যখন ‘নউজিয়া’ আর ‘দ্য ওয়াল’ বেরোল। যখন প্রথম আমার প্রকাশ হবার মতো বই বাতিল হলো আমি কিছুটা হতাশ ছিলাম। আর যখন ‘শি কেইম টু স্টে’-এর প্রথমখণ্ড বাতিল হয় এটা ভীষণ কষ্টের ছিল। তারপর ভাবলাম আমার সময় নেয়া উচিত। আমি অনেক লেখককে চিনতাম যারা শুরু করার ক্ষেত্রে ধীরগতির ছিলেন। আর লোকে সব সময় স্তেনধাল-এর কথা বলত, যিনি ৪০ হবার আগে লেখা শুরু করেননি।

আপনি যখন প্রথমদিকে উপন্যাস লিখতে শুরু করেন আপনি কি আমেরিকান লেখক দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন?

‘শি কেইম টু স্টে’ লিখতে গিয়ে, আমি অবশ্যই হেমিংওয়ে দ্বারা প্রভাবিত ছিলাম যেহেতু ইনিই তিনি যিনি সংলাপের শাদামাটা দিক আর জীবনের ছোট ছোট দিকের গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন।

উপন্যাস লেখার সময় আপনি কি খুব সুক্ষ্ম পরিকল্পনা আঁকেন?

তা করিনি, জানেন, দশ বছর সময়কালে উপন্যাস লেখা, যে সময় টা আমি আমার জীবনস্মৃতির ওপর কাজ করছিলাম। আমি যখন দা মান্দারিনস লিখেছিলাম, উদাহরণস্বরূপ, আমি প্রাপ্ত বিষয় কে ঘিরে পরিবেশ আর চরিত্র তৈরী করেছিলাম, আর একটু একটু করে পরিকল্পনাকে একটা চেহারা দিয়েছিলাম। কিন্তু সাধারণত আমি পরিকল্পনা করার অনেক আগে থেকেই উপন্যাস লিখতে শুরু করি।

লোকে বলে, আপনার দারুণ নিজের প্রতি নিয়মনিষ্ঠতা আছে যার ফলে আপনি কোনো একদিন ও কাজ ছাড়া থাকেন না। কখন কাজ শুরু করেন?

আমি সব সময় কাজের প্রতি তাড়ায় থাকি, যদিও সাধারণত আমি দিনের শুরুতেই কাজ করা অপছন্দ করি। আমি প্রথমে চা খাই, আর তারপর, ১০ টায় আমি নীচে নেমে ১ টা অব্দি কাজ করি। তারপর বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাত করে ৫ টায় আবার কাজে ফিরে গিয়ে ৯ টা পর্যন্ত কাজ করি। আমার বিকালে কাজ খূঁজে পেতে সমস্যা হয় না। আপনি চলে গেলে হয় আমি সংবাদপত্র পড়ব অথবা কেনাকাটায় যাব। বেশির ভাগ সময় এসব আমাকে আনন্দ দেয়।

সার্ত্রের সঙ্গে কখন দেখা হয়?

প্রতি সন্ধ্যায় আর প্রায়ই মধ্যাহ্নভোজে। আমি সাধারণত সন্ধ্যায় তার ওখানে কাজ করি।

এক বাসা থেকে আরেক বাসায় যেতে বিরক্ত লাগে না?

না, যেহেতু আমি পাণ্ডিত্যপূর্ণ  বই লিখছি না, আমি সব কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে যাই আর এতা কাজেও লাগে।

আপনি কি সঙ্গে সঙ্গে কাজে ডুবে যান?

এটা কিছুটা নির্ভর করে আমি কি লিখছি তার ওপর। যদি কাজ ভাল মতো এগোয় আমি মিনিট ১৫ বা আধাঘন্টা আগের দিন যা লিখেছিলাম তা পড়ি, আর কিছু ভুল ঠিক করি। তারপর সেখন থেকেই শুরু করি। কাজের সূত্র খুঁজে পেতে আমি যা লিখেছি আমাকে পড়তেই হবে।

আপনার লেখক বন্ধুদের কি আপনার মতো অভ্যাস আছে?

না, এটা অনেকটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। গেনেত, উদাহরণস্বরূপ, আলাদাভাবে কাজ করেন। তিনি যখন কাজ করেন ছয় মাস ১২ ঘন্টা ধরে কাজ করেন আর যখন শেষ করেন বাকি ৬ মাস কিছুই করেন না। আমি যেমন বলেছি, আমি ছুটির দুতিন মাস যে সময় আমি ভ্রমণ করি সেটা বাদে প্রতিদিন কাজ করি, আর সাধারণত করি না। আমি সারাবছর খুব অল্প পড়ি, আর যখন যাই তখন একটা বড় বইভর্তি চামড়ার ব্যাগ নেই, সেই বই গুলি যা পড়ার সময় হয়নি। কিন্তু যদি এই যাত্রা এক মাস বা ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হয় আমি অস্বস্তি বোধ করি, বিশেষ করে যদি দুই বই এর মাঝে থাকি আমি যদি কাজ না করি ক্লান্ত হই।

আপনার মূল পাণ্ডুলিপি কি সব সময় সাধারণভাবে লেখা? কে তাদের  পাঠোদ্ধার করে? নেলসন এলগ্রেন বলেন যে তিনি সেই অল্পকজনের মধ্যে একজন যিনি আপনার হাতের লেখা পড়তে পারেন।

আমি জানি না কীভাবে টাইপ করতে হয়, কিন্তু আমার দুইজন টাইপিস্ট আছেন যারা আমার লেখা পাঠোদ্ধার করেন। আমি যখন আমার বই এর শেষ কিস্তির ওপর কাজ করি আমি পান্ডুলিপি অনুকরন করি। আমি খুব সতর্ক। আমি অনেক শ্রম দেই। আমার লেখা বেশ স্পষ্ট।

‘দ্য ব্লাড অব আদার’ এবং ‘অল মেন আর মর্টাল’-এ আপনি  সময় নিয়ে কাজ করেছেন। আপনি কি জয়েস বা ফকনার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন?

না, এটা ব্যক্তিগত চিন্তা ছিল। আমি সব সময় সময়ের প্রবাহ নিয়ে সচেতন ছিলাম। আমি সব সময় ভেবেছি আমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে। এমনকি আমার যখন ১২ বছর ছিল আমি ভাবতাম ৩০ বছর হয়ে যাওয়া খুব বিব্রতকর। আমার মনে হলো কিছু হারিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে আমি জানতাম মি কি পেতে পারতাম, আর জীবনের কিছুটা সময় আমাকে অনেক শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু সব কিছু সত্বেও আমি সময়ের এই ধারাইয় খুব আক্রান্ত হতাম আর এই ব্যপারে যে মৃত্যু ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। আমার মতে, সময়ের সমস্যার সঙ্গে মৃত্যুর যোগসূত্র রয়েছে, এই চিন্তা নিয়ে যে আমরা অবধারিতভাবে এর কাছাকাছি যাচ্ছি ক্রমশ, ক্ষয় হয়ে যাওয়ার ভয় নিয়ে। এটা এমন, বাস্তব কে একপাশে রেখেও যে সবকিছুই ক্ষয় হয়, ভালোবাসা কমে যায়। সেটাও খুব ভয়ঙ্কর, যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমার কোন ক্ষতি হয়নি কখনো। সব সময় আমার জীবনে দারুন ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। আমি সব সময় প্যারিস এ থেকেছি, কমবেশি একি পাড়ায়। সার্ত্রের সঙ্গে আমার সম্পর্ক  অনেক দিন বজায় ছিল। আমার অনেক পুরানো বন্ধু আছে যাদের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ বজায় আছে। কাজেই ব্যপারটা এমন না যে সময় সবকিছুই ভেঙ্গে দেয় কিন্তু ব্যপার টা এমন যে আমি সব সময় নিজের ভার বহন করি। মানে এই ব্যাপার যে আমার পেছনে অনেক সময় গেছে আর সামনে আরো আছে। আমি তাদের মূল্য দেই।

আপনার জীবনস্মৃতির দ্বিতীয়ভাগে আপনি সার্ত্রের এমন সময়ের চিত্র এঁকেছেন যখন তিনি ‘নজিয়া’ লিখছেন। আপনি তার এমন চিত্র এঁকেছেন যাতে তিনি এমন জিনিশের প্রতি মোহগ্রস্ত যাকে রাগের মাথায় তিনি সমালোচনা করেন। আপনাকে সব সময় হাসিখুশি মনে হয়েছে। তারপরেও নিজের উপন্যাসে মৃত্যুচিন্তার বিষয়টি অনাবৃত করেছেন যা আমরা সার্ত্রের মধ্যে কখনো পাইনি।

কিন্তু স্মরণ করুন, তিনি ‘দ্য ওয়ার্ডস’ এ কি বলেছেন। যে তিনি কখনো মৃত্যুর পদধ্বনি অনুভব করেননি, যেখানে তার অন্য ছাত্র সাথীরা যেমন নিজান, ‘আদেন’ ‘আরেবি’র লেখক এটায় আচ্ছন্ন ছিল। এক দিক দিয়ে, সার্ত্রে মনে করতো সে অমর হবে। সে সবকিছু তার সাহিত্যকর্মের ওপর বাজি রেখেছিল এই আশায় যে তার কাজ বেঁচে থাকবে, যেখানে আমার ক্ষেত্রে এটা জানা সত্বেও যে আমার ব্যক্তিগত জীবন হারিয়ে যাবে আমার কাজ বেঁচে থাকবে কিনা তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না। আমি সব সময় জানতাম যে জীবনের সাধারণ বিষয়গুলি হারাবেই, মানুষের দৈনন্দিন কাজ, তার  ভূমিকা, তার অতীত অভিজ্ঞতা। সার্ত্রে ভেবেছিলো জীবন শব্দের ফাঁদে ধরা পড়বে, আর আমি ভেবেছি শব্দরা জীবন নয়, পুনর্জন্ম, যা মৃত, বলা যায়।

এটা সম্যকভাবে যুক্তিযুক্ত। কেউ কেউ দাবী করে আপনার উপন্যাসে জীবন কে রূপান্তরের শক্তি নেই। তারা আভাস দেয় যে আপনার চরিত্রগুলি আপনার চারপাশের মানুষের নকল।

আমি জানি না। কল্পনা কি? দূরবর্তী পর্যায়ে এটা কিছু পরিমাণ সাধারণত্ব আয়ত্ব করা, সত্যকে মেনে নেয়া যে কোনোটা কী কে কীভাবে আসলে বাঁচে। যে কাজগুলি বাস্তবসম্মতো নয় তা টানে না যদি না তা অসংযত হয়, উদাহরণস্বরূপ, আলেক্সানডার দুমাস বা ভিক্টর হূগোর উপন্যাস যা একরকমের মহাকাব্য। কিন্তু আমি বানানো  গল্পকে কাল্পনিক বলব না বরণ কৃত্রিম কাজ বলব। আমি যদি নিজে স্বপক্ষে বলতে যাই আমি তলস্তয় এর ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর কথা বলব, যার প্রতিটা চরিত্রই বাস্তবজীবন থেকে নেয়া।

আপনার চরিত্রগুলির দিকে ফেরা যাক। আপনি কীভাবে তাদের নাম বাছাই করেন?

আমি তা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করিনা। আমি ‘শি কেইম টু স্টে’-তে জেভিয়ার নাম বেছেছিলাম কারণ আমার শুধু একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল যে সেই নামের। আমি যখন নাম খুঁজি আমি টেলিফোন পঞ্জি ব্যবহার করি অথবা পূর্বে সাক্ষাত হওয়া কারো নাম স্মরণ করার চেষ্টা করি।

আপনি কোন চরিত্রগুলির প্রতি বেশি আকৃষ্ট?

আমি জানি না। তাদের সম্পর্কের চেয়ে চরিত্রের প্রতি আমার আগ্রহ কম, যদি সম্পর্ক টা ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের হয়। সমালোচক ক্লডি রয় এই পয়েন্ট খুঁজে পেয়েছেন।

আপনার প্রত্যেক উপন্যাসে আমরা একটা নারী চরিত্র পাই যে মিথ্যা ধারণা দ্বারা চালিত হয় আর যে পাগলামিতে আচ্ছন্ন।

অনেক আধুনিক নারীই এরকম। তাদের এমন ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করতে হয় যা তারা নয়, উদাহরণস্বরূপ, বিখ্যাত বাঈজী হতে গিয়ে নকল ব্যক্তিত্বে পরিচিত হওয়া । তারা মানসিক বিকারের একদম কিনারে। আমি সেই ধরনের মেয়েদের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল। সুন্দর ভারসাম্য বজায় রাখা গৃহিনী ও মা থেকে এদের প্রতি আমি বেশি আগ্রহী। আরো মহিয়ারা আছেন অবশ্যই, তারা যারা সৎ ও স্বাধীন, যারা কাজ করে ও সৃষ্টি করে।

আপনার কোনো নারী চরিত্রই ভালোবাসা থেকে মুক্ত নয়। আপনি প্রেমের উপাদান পছন্দ করেন।

ভালোবাসা খুব দারুণ অধিকার। সত্যিকারের ভালোবাসা, যা খুব দুর্লভ, নারী পুরুষের জীবনকে ঋদ্ধ করে, যারা অভিজ্ঞতাটা পায়।

আপনার উপন্যাসে, মেয়েরা—আমি মনে করি ‘শি কেইম টু স্টে’-এর ফ্রান্সোইস আর ‘দ্য মান্দারিন’-এর এনি যারা এই অভিজ্ঞতা বেশি পেয়েছে।

এর কারণ হলো সবকিছু সত্বেও মেয়েরা ভালবাসায় নিজের টুকু বেশি দেয় কারণ বেশির ভাগ মেয়েদেরই এটা ছাড়া তাদের নিংড়ে নেয়ার মতো কিছু নেই। হয়ত তাদের মধ্যে গভীর সমব্যথার যোগ্যতা আছে যা ভালবাসার ভিত্তি। হয়ত এটাও হতে পারে যে আমি মেয়েদের মধ্যে ছেলেদের থেকেও বেশি নিজেকে প্রক্ষিপ্ত করতে পারি। আমার নারী চরিত্রগুলি পুরুষ চরিত্র থেকে বেশি সমৃদ্ধ।

আপনি কখনো স্বাধীন আর সত্যিকারের  মুক্ত নারী চরিত্র তৈরী করেন নি যা একভাবে বা অন্যভাবে ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এর তত্ত্ব অঙ্কন করে। কেন?

আমি মেয়েদের সেভাবেই দেখিয়েছি তারা যেমন, বিচ্ছিন্ন মানুষ হিশেবে, সেভাবে না যেভাবে উচিত।

আপনার দীর্ঘ উপন্যাস ‘দ্য মান্দারিন’ এর পরে আপনি গল্প লেখা বন্ধ করে দেন আর স্মৃতিকথার ওপর কাজ শুরু করেন।  এই দুই ধরনের সাহিত্যের মধ্যে কোন টা কে অগ্রাধিকার দেন?

আমি দুটাই পছন্দ করি।  তারা ভিন্ন ধরনের সন্তুষ্টি ও হতাশা পেশ করে। আমার স্মৃতিকথা লেখার ক্ষেত্রে বাস্তব দ্বারা উৎসাহিত হওয়া খুব মনোজ্ঞ। অপরপক্ষে, যখন কেউ রোজকার জীবনে বাস্তব অনুসরণ করে যেমন আমি, কিছু নির্দিষ্ট গভীরতা কিছু নির্দিষ্ট ধরনের শ্রুতি অর্থ আছে যা মানুষ অবজ্ঞা করে। যাই হোক, উপন্যাসে, মানুষ এই চিন্তা জানাতে পারে, এই প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষীণস্বর, কিন্তু এখানে কিছু মিথ্যে কথা আছে যা অস্বস্তিকর। মানুষের উদ্ভাবনের প্রতি মনোযোগি হওয়া উচিত মিথ্যা বাদ দিয়ে। আমি অনেকদিন ধরেই আমার শৈশব আর যৌবন নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম, আমি তাদের সঙ্গে খুব গভীর সম্পর্ক লালন করেছি কিন্তু আমার কোন বই তে তার ছাপ নেই। এমনকি আমার প্রথম উপন্যাস লেখার আগে আমার হৃদয় থেকে হৃদয়ে কথা বলার ইচ্ছা ছিল। এটা খুব আবেগি ইচ্ছা ছিল, খুব ব্যক্তিগত চাহিদা। ‘মেমোইরস অব আ ডিউটিফুল ডটার’-এর পরে আমি অসন্তুষ্ট ছিলাম আর তারপর আমি অন্যকিছু করার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু পারিনি। আমি নিজেকে বলেছিলাম, ‘আমি মুক্ত হবার জন্য যুদ্ধ করেছি। স্বাধীনতার সঙ্গে আমি কি করেছি? কী লাভ হলো?’ আমি উত্তরভাগ লিখেছিলাম যা আমাকে ২১ বছর থেকে বর্তমান সময়ে নিয়ে এসেছে, ‘দ্য প্রাইম অব লাইফ থেকে ফোর্স অব সারকামস্টানসেস।

কয়েক বছর আগে ফর্মেন্টর এর লেখকদের সভায় কার্লো লেভি ‘দ্য প্রাইম অব লাইফ’-কে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রেমকাহিনি হিশেবে অভিহিত করেছেন। সার্ত্রে প্রথমবারের মতো মানুষ হিশেবে উপস্থিত হয়েছেন। আপনি সার্ত্রের এমন রূপ সামনে এনেছেন যাকে কখনো সঠিকভাবে বোঝা হয়নি, যে মহামানব সার্ত্রে থেকে আলাদা।

আমি এটা সচেতনভাবে করেছি। সে চায়নি আমি তাকে নিয়ে লিখি। শেষে, তিনি যখন দেখলেন আমি যেভাবে বলি সেভাবেই ওনাকে নিয়ে বলেছি তিনি আমাকে স্বাধীনতা দিলেন।

আপনার মতে, ব্যপারটা এমন কেন যে ২০ বছর ধরে একটা মর্যাদার পরেও লেখক সার্ত্রে কে এখনো ভুল বোঝা হয় আর এখনো হিংস্রভাবে সমালোচক দ্বারা আক্রান্ত হন।

রাজনৈতিক কারণে। সার্ত্রে সেই মানুষ যিনি সেই শ্রেণির খুব কড়া বিরোধিতা করেছেন যে শ্রেণিতে তার জন্ম এবং যার কারনে তাকে বিশ্বাসঘাতক বলা হয়। কিন্তু সেইটা সেই শ্রেণি যার টাকা আছে আর বই কিনতে পারে। সার্ত্রের অবস্থা স্ববিরোধী। সে বুর্জোয়াবিরোধী লেখক যাকে বুর্জয়াশ্রেণি পড়ে আর তাদের জাত উদ্ভুত বলে উতসাহিত করা হয়। বুর্জোয়াশ্রেণির মাঝে সাংস্কৃতিক আধিপত্য আছে আর তারা ভাবে তারা সার্ত্রের জন্ম দিয়েছে। সেই সঙ্গে তারা তাকে ঘৃণা করে কারণ সে তাদের আক্রমন করে।

প্যারিস রিভিউতে হেমিংওয়ের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, ‘আপনারা সবাই এই ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেন যে, একজন রাজনীতি মনস্ক লেখকের লেখা তখনই স্থায়ীত্ব পাবে যদি পড়ার সময় আপনি রাজনৈতিক বিষয়গুলি এড়িয়ে পড়েন। অবশ্যই আপনি সহমতো হবেন না। আপনি এখনো অঙ্গীকারে বিশ্বাসী?

হেমিংওয়ে যথাযথভাবে সেই ধরনের লেখক যে কখনোই নিজের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হতে চাননি। আমি জানি তিনি স্পেনীয় বেসামরিক যুদ্ধে যুক্ত ছিলেন কিন্তু সাংবাদিক হিশেবে।  হেমিংওয়ে কখনোই গভীরভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন না কাজেই তিনি ভাবেন সাহিত্যে যা চিরন্তন তা সেকেলে বা অঙ্গীকারবদ্ধ নয়। আমি একমতো নই। বেশির ভাগ লেখকের ক্ষেত্রে এটা তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ যা আমি পহন্দ বা অপছন্দ করি। বিগত দিনেও এত বেশি লেখক ছিলনা যাদের কাজ দায়বদ্ধ ছিল।আর একজন তার কনফেশন যতটা আগ্রহ নিয়ে পড়ে রুশোর সোশাল কন্ত্রাক্ট ও ততটাই আগ্রহ নিয়ে পড়ে কেউ আবার ‘দ্য নিউ হেলইস’ পড়েই না।