সি. ভি. চন্দ্রশেখর

সময় তো যথেষ্ট নয় জীবনে শেখার জন্য, অনেকগুলি জীবন পেলে তবে হয়তো শেখা হতো অধিকাংশ সি. ভি. চন্দ্রশেখর


 

[গুরু সি. ভি. চন্দ্রশেখর, ভরতনাট্যম নৃত্যধারার একজন কিংবদন্তী নৃত্যশিল্পী। একাধারে তিনি মিউজিশিয়ান, কম্পোজার, কোরিওগ্রাফার এমনকি শিক্ষকতাও করেছেন বহু বছর বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি এবং এম.এস ইউনিভার্সিটিতে। এসেছেন বাংলাদেশে নৃত্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘নৃত্যনন্দন’-এর আমন্ত্রণে। তাঁর এ সফরে থাকছে নৃত্য পরিবেশনাও। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬-তে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে ভরতনাট্যম পরিবেশন করেন তিনি। এ প্রযোজনার শিরোনাম ‘কণকমঞ্জরী’। এর আগের দিন শিল্পকলা একাডেমীর রিহার্সেল রুমে তার সঙ্গে কথা বলেন জুয়েইরিযাহ মউ। সাক্ষাৎকারটি পূর্বে বাংলামেইল২৪ডটকম-এ প্রকাশ হয়। আজ আবার তা কথাবলি-র পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো]

 

গুরু রুকমিনি দেবীর কলাক্ষেত্রে প্রবেশের মধ্য দিয়ে আপনার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তার কথা শুনতে চাই।

এটা অনেক দীর্ঘ, বিস্তারিত বলতে অনেক সময় লাগবে। যেটুকু বলতে হয় আমি যখন কলাক্ষেত্রে যেতে শুরু করি তখন আমার বয়স মাত্র দশ বছর। মিউজিক দিয়ে শুরু করেছিলাম আমি। তারপর নৃত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলাম।

আপনি কম্পোজার, নৃত্যশিল্পী, মিউজিশিয়ান, গবেষক এবং শিক্ষক হিসেবেও কাজ করে গেছেন। কখনো কি এ সমস্ত কাজ পাশাপাশি করতে গিয়ে কোন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। বা মনে হয়েছে একটা কাজের ধরণ প্রভাব ফেলছে অন্য কাজে?

না, আমার ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। আমি মনে করি যে কাজটিই আমি করি না কেন সে কাজে আমার দখল থাকাটা জরুরী। মিউজিক শেখা শুরু করেছিলাম নৃত্য শুরু করার অনেক বছর আগেই। কাজেই মিউজিশিয়ান হওয়ার অ্যাডভানটেজ আমি নিতে পেরেছি নৃত্যশিল্পী হিসেবে নিজেকে গড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও। এরপর ধীরে ধীরে ক্ল্যাসিকাল মিউজিক, কর্ণাটকী মিউজিক শিখলাম, নিজের শিক্ষার ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করার চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। এবং এখন অবধিও আমি শিখছিই তো। এখনো কত কী আছে এই সেক্টরে যা আমি জানি না। আসলে সময় তো যথেষ্ট নয় জীবনে শেখার জন্য। অনেকগুলো জীবন পেলে তবে হয়তো শেখা হতো অধিকাংশ। কে জানে!

আপনি শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন, এখনো করছেন। আমি একাডেমির ব্যাপারে কথা বলতে চাইছিলাম। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি, এম এস ইউনিভার্সিটি-র সঙ্গে অনেক বছর যুক্ত ছিলেন। তো একাডেমি ভরতনাট্যম নাচের ক্ষেত্রে এক্সপেরিমেন্টকে কতটা গ্রহণ করে?

কেন করবে না। আমরা তো শিক্ষার্থীদের বলছি প্রজেক্ট করতে। গ্রুপ ওয়ার্ক থাকছে, নিজস্ব কোরিওগ্রাফির মাধ্যমে চিন্তা-ভাবনা দেখানোর সুযোগ থাকছে। এগুলো তো এক্সপেরিমেন্টাল ওয়ার্কই, তাইনা? কিন্তু এক্সপেরিমেন্ট বলতে যা-ইচ্ছে হল তাই করাকে আমি মিন করছি না। এক্সপেরিমেন্ট করার মানে হল আপনাকে একটা প্রশিক্ষণ একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে আগে যেতে হবে, জানতে হবে। তারপর নিজের মেধাকে ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু স্পেশাল কিছু সৃষ্টি করাটাকেই এক্সপেরিমেন্টাল ওয়ার্ক বলা যায়। নতুবা শুধু কপি করা হয় অন্যের কাজ থেকে। আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের সবসময় বলি পিওর থাকতে নিজেদের কাজের ব্যাপারে, এবং আমার গুরুও আমাকে তাই শিখিয়েছেন।

ভরতনাট্যম নৃত্যে পোষাক, সাজসজ্জা এবং মিউজিকের ক্ষেত্রে এক্সপেরিমেন্ট করাকে আপনি কতখানি যুক্তিসঙ্গত মনে করেন বা সাপোর্ট করেন?

আমি একটা ব্যাপারে খুব শক্ত অবস্থানে থাকি, সেটা হল অন্য কোনো ডান্স-ফর্মে আমি কাজ করি না। ভরতনাট্যম নিয়েই আছি। কিন্তু ব্যাপার হল যাই আমি করি না কেন সবকিছুর পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকা চাই। যেমন আমি বিমূর্ত ধারণা বা মিথলজি নিয়ে যখন কাজ করছি তখন সেটার প্রয়োজনে আমার যা করা দরকার করতে পারি। পরিবেশ-প্রকৃতি আমাকে খুব টানে। এজন্যই আমি বোটানীর শিক্ষার্থী ছিলাম প্রথম জীবনে। প্রকৃতিকেও আমি তুলে ধরতে চাই, ধরেছি আমার অনেক কাজে। কিন্তু আমার নাচের গ্রামার ঠিক থাকতে হবে, এটা গুরুত্বপূর্ণ।

কনটেম্পরারি নৃত্যশৈলী সম্পর্কে আপনার মত কী ?

আমি কোনো কনটেম্পরারি কাজেরই বিপক্ষে নই। কনটেম্পরারি কাজ অনেক ইউনিক আর অকৃত্রিম হতে পারে। কনটেম্পরারি আর্ট সৃষ্টি করার বিদ্যে কিন্তু থাকতে হয়, এটাও শেখার বিষয়। আপনি একটা মুহূর্ত নিলেন ভরতনাট্যম থেকে, আরেকটা অংশ মণিপুরী আবার কত্থক এবং সব একসঙ্গে মিশিয়ে বললেন সেটা কনটেম্পরারি ডান্স তা তো হয় না। গভীরভাবে ভাবতে হয়, এটার এক্সিকিউশন অতো সহজ নয়।

আপনি কি মনে করেন প্রতিটি নৃত্যশিল্পীরই একটি নির্দিষ্ট ডান্স-ফর্ম নিয়ে কাজ করা উচিৎ?

আমি ব্যক্তিগতভাবে ভরতনাট্যম চর্চা করি। অনেক কিছু দেখা হয়েছে, অনেক ডান্স ফর্ম জানা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো শেখা হয়েছে তা কিন্তু আমি বলবো না। হয় কী, একজন যদি একটা নির্দিষ্ট ডান্স ফর্মের উপর ফোকাসড থাকে তবে সে সেটার গ্রামার জানতে পারছে, সেটা দখলে নিতে পারছে। এখন অনেক কিছু শিখতে গেলে দেখা যায় কোনটাই আর ভাল ভাবে শেখা হচ্ছে না। তাই ইতিবাচক কিছু তখন আর বের হয়ে আসে না।

এই যে যারা কর্মশালা করছেন, বাংলাদেশে আপনার এই তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কী বলবেন?

কর্মশালার এই উদ্যোগ বেশ প্রশংসনীয়। এখন মনে হয় ভরতনাট্যম বাংলাদেশে অনেক দূর এগিয়েছে, কারণ এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের যোগাযোগ তো বাড়ছে, এগুলোর প্রভাব পড়ছে। শিল্পীরা বাইরে থেকে আসছেন, অনেকে এখান থেকে বাইরে পড়তে যাচ্ছেন। আমার ছাত্র বেলায়েত অনেক বছর আগে বারোদা ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ে এখানে এসেছিল। তখনকার অবস্থা আর এখন বাংলাদেশের অবস্থার মধ্যে অনেক তফাৎ, অনেক এগিয়েছে নৃত্য অঙ্গনে ভরতনাট্যমের চর্চা।

এখন শেখার সুযোগও অনেক, ইন্টারনেট এর যে সুবিধা আমরা পাইনি তা এখনকার প্রজন্ম পাচ্ছে। আবার ওভার কনফিডেন্ট হয়ে অনেকে ভুলও করছে। কারণ অনেক সঠিক তথ্যের পাশাপাশি ইন্টারনেট অনেক ভুল তথ্যেও ভরে গেছে।

‘কণকমঞ্জুরী’ সম্পর্কে বলেন

শিরোনামটি ভালো লেগে গেছে। আমার এক মেয়ের নাম মঞ্জুরী। কনকমঞ্জুরী মানে সোনালী মঞ্জুরী। এটা দারুণ এক চিন্তা, শ্রীমতী শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বেশ ভালো।