কমরেড গণপতি

গেরিলা যুদ্ধ গড়ে তোলা ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো গণভিত্তিকে মজবুত করা কমরেড গণপতি


 

[কমরেড গণপতি। নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মাওয়িস্ট)-এর সাধারণ সম্পাদক। জন্ম ১৬ জুন ১৯৪৯ সালে হায়দারাবাদের করিমনগরে। তিনি ইশকুলে শিক্ষকতা করতেন। যৌবনে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আসল নাম মুপ্পাল্লা লক্ষ্মণ রাও। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ মাওয়িস্ট ইনফরমেশন বুলেটিনকে কমরেড গণপতি এই সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন। এটির প্রথম ধারাবাহিক ভাষান্তর প্রকাশ হয় লালসংবাদে। এখন সেই সাক্ষাৎকারটিরই সম্পাদিত ভাষান্তর কথাবলির পাঠকদের জন্য একসঙ্গে আবার প্রকাশ হলো। এটি বাঙলায় ভাষান্তর করেন রিজওয়ানা তৃষা।]

 

গত দশ বছরে পার্টির কী কী উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

১৯২৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া গঠিত হবার পর থেকে আমাদের দেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময় পার করেছে। এর মধ্যে গত দশকটি অনন্য সাধারণ, কারণ এ দশকে নকশালবাড়ির পর থেকে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে পরিচালিত দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমাদের দেশের শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাসে কিছু অভিনব ও নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী গত দশক। এই দশকের তাৎপর্য্যপূর্ণ ঘটনাগুলি হলো—

১. ভারতে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য একটি একক গাইডিং সেন্টারের সূচনা করা। পার্টি, আর্মি ও United Front বিপ্লবের এই তিনটি ম্যাজিক অস্ত্র আগের থেকে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে; রাজনৈতিক ও সামরিক লাইন, যুক্তফ্রন্টের নীতিমালা ও অন্যান্য নীতিমালাকে ঐক্যবদ্ধ পার্টির দলিলপত্র হিসেবে সমৃদ্ধকরণ।

২. কংগ্রেসের দলিলপত্র, নীতিমালার কাগজপত্র, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সার-সংক্ষেপ, আর্টিকেল ইত্যাদির সমন্বয় সাধন করা; মিলিটারি লাইনের আরো উন্নয়ন সাধন, গেরিলা যুদ্ধকৌশলের তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে জনগণের বিশাল অংশগ্রহণ ঘটেছে যা এই লড়াইতে সত্যিকারের গণযুদ্ধের বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছে ও নতুন নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে যার ফলে শত্রুর নৃশংসতম বিপ্লব বিরোধী দমন অভিযান পরাভূত হয়েছে। জল, জঙ্গল, ভূমি, সম্মান ও অধিকার বিষয়গুলিতে জনগণের বড় অংশ বিশেষ করে কৃষকদের অংশগ্রহণে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে Revolutionary People's Committees আকারে কৌশলগত যুক্ত ফ্রন্ট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধি ও সুপরিকল্পিত যুক্তফ্রন্ট গঠনে নতুন ও অধিকতর ভালো অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। শাসক শ্রেণির গণ বিরোধী, দেশ বিক্রিকারী উন্নয়ন মডেলের বিপরীতে বিপ্লবী গণ কমিটি (RPCs) কর্তৃক উন্নয়নের বিকল্প মডেল স্বীকৃতি পেয়েছে যেটি সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব।

বর্তমানে পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। তা সত্ত্বেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সহযোগিতায় গোটা দেশব্যাপী ফ্যাসিবাদী ভারতীয় সরকার পরিচালিত নজিরবিহীন বর্বর দমন অভিযানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় বিপ্লব টিকে আছে এবং ভারত তথা গোটা বিশ্বের মানুষের মাঝে বিপ্লবের আশাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অপারেশন গ্রিন হান্টের বিরুদ্ধে ও গণযুদ্ধের স্বপক্ষে লড়াইরত বিপ্লবী গণমানুষের জন্য ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগণের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন অর্জিত হয়েছে।

সিপিআই (মাওবাদী) ও সিপিআই (এমএল) নকশালবাড়ির একটি একক পার্টিতে একীভূত হবার ঘটনা আমাদের দেশে প্রকৃত বিপ্লবীদের মাঝে ঐক্যবদ্ধকরণের প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। ভারতের গণযুদ্ধ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে যাকে ঘিরে মাওবাদী শক্তিগুলির মধ্যে আন্তর্জাতিক ঐক্য, আন্তর্জাতিক সংহতি ও সমর্থন আন্দোলন গড়ে তোলা যায়। মহান নকশালবাড়ির সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের ফলে সূচিত এবং আমাদের পার্টির মহান প্রতিষ্ঠাতা নেতা কমরেড চারু মজুমদার ও কানহাই চট্টোপাধ্যায় প্রণীত নতুন মতাদর্শ, নতুন রাজনীতি, নতুন লাইন, নতুন পার্টি, নতুন আর্মি ও নতুন গণ ফ্রন্টের ওপর ভিত্তি করে গত দশকের এই নতুন ও তাৎপর্য্যপূর্ণ উন্নয়নগুলি সাধিত হয়েছে।

এক দিকে শত্রুর নিরন্তর বর্বরোচিত দমন অভিযানের মধ্য দিয়ে পাল্টা লড়াই চালিয়ে ও অন্যদিকে আন্দোলনের বিভিন্ন সংকট মুহূর্তে পার্টির ভেতরে গজিয়ে উঠা ডান ও ‘বাম’ সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে তিক্ত সংগ্রাম চালিয়ে গত দশকের সকল উন্নয়নগুলি অর্জিত হয়েছে। ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য কমিউনিস্ট ও সাধারণ মানুষ উভয়ের গৌরবময় আত্মদান। তাদের আত্মদান ছাড়া গত দশকের এতগুলি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের কোনটাই অর্জিত হত না। এই আত্মদানগুলির মধ্য দিয়ে পার্টি একটি বিকল্প ধারার চিন্তা ও সংস্কৃতিকে সামনে তুলে এনেছে যেটি সর্বোচ্চ মানবীয় মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এ ধারা, শাসকশ্রেণি কর্তৃক জনসাধারণের মাঝে ধীরে ধীরে নষ্ট, অধঃপতিত ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা ও সংস্কৃতির ধারা প্রবেশ করানোর যে প্রক্রিয়া, তার বিরোধী। এভাবে, এই আত্মদানগুলি সমাজের নির্যাতিত শ্রেণিকে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য লড়াই করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

 

বর্তমান সময়ে পার্টি কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে? সেগুলি অতিক্রম করার কী কী সুযোগ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

বর্তমান সময়ে আমাদের আন্দোলন যে সব প্রধান চ্যালেঞ্জগুলির সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলি উল্লেখ করছি। প্রথমত, আমাদের নেতৃত্বকে বিশেষ করে পার্টির কৌশলগত নেতৃত্বকে রক্ষা করা। নতুন পার্টি গঠনের পর কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়ের পার্টি কমিটি পর্যন্ত সকল স্তরের অনেক নেতাকে আমরা হারিয়েছি। নেতৃত্বকে রক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে আমাদেরকে কাজের ক্ষেত্রে অবশ্যই গোপন ও যথাযথ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, ভুলগুলি সংশোধন করতে হবে, অনুশীলন থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে কাজে লাগাতে হবে, নতুন নেতৃত্বকে প্রস্তুত করতে হবে এবং বিপ্লবের সাফল্যের শর্ত হিসেবে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় একটি শক্তিশালী পার্টির প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে সমগ্র পার্টির ভেতরে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গ্রামাঞ্চলে ও শহর এলাকায় বিপ্লবী আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পার্টি যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এটি তার একটি কারণ। যে সমস্ত এলাকায় আমাদের পার্টি দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করেছে কিন্তু পর্যায়ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়েছে সে সমস্ত এলাকায় আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করা ও বিস্তৃত করা আমাদের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ। একইভাবে, নতুন এলাকাতেও আন্দোলন সম্প্রসারিত করতে হবে এবং গণযুদ্ধের ক্ষেত্রকে বর্ধিত করার লক্ষ্যে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। এই আন্দোলনের অভিজ্ঞতার আলোকে অতীতের ভুলগুলির পুনরাবৃত্তি না করে বিপ্লবের অগ্রগতির জন্য ক্রমবর্ধমান অনুকূল অবস্থাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। এভাবে আমরা অবশ্যই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।

তৃতীয়ত, কেউ কেউ বলছেন ভারতের আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে ভারত একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এগুলি বলে বিপ্লবী ক্যাম্পে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে এধরনের ভুল দৃষ্টিভঙ্গিও তারা সামনে নিয়ে আসছেন। কিন্তু ভারতের মতো একটি আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী রাষ্ট্রে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করার জন্য দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধই একমাত্র সঠিক বিপ্লবী উপায় হিসেবে অনুশীলনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং, এ জাতীয় ভ্রান্ত ধারণার বিপক্ষে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং এগুলি প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদেরকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলি গভীর ভাবে জানতে হবে ও সে অনুযায়ী আমাদের যুদ্ধ কৌশলে যথোচিত পরিবর্তন আনয়ন করতে হবে।

চতুর্থত, ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ফ্যাসিবাদী শক্তি এখন কেন্দ্রের ক্ষমতায় এসেছে যারা সামন্তবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির দৃঢ় প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া দালালদের মদদপুষ্ট মোদী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে আর তার সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যুক্ত হয়েছে সঙ্ঘ পরিবার উদ্ভাবিত সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ।

ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি বিদেশী ও দেশীয় বড় বড় পুঁজিবাদী ভূস্বামীদের লোভ মেটাতে বিপজ্জনক গতিতে সাম্রাজ্যবাদপন্থী, দেশ বিক্রির নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে আরম্ভ করেছে এবং সেই সঙ্গে হিন্দু ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমকে বিভিন্ন রূপে এগিয়ে নিতে চাইছে। সকল গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও দেশপ্রেমিক শক্তিকে সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন পথ দেখাবে। সংগ্রামের এই যুদ্ধক্ষেত্রে সমাজের আরো অনেক নতুন শ্রেণি, সামাজিক গোষ্ঠী থেকে জনগণ আসবে এবং দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের অগ্রগতির ক্ষেত্রে নতুন নতুন সুযোগ তৈরী হবে।

পঞ্চমত, বিশ্বের বাস্তব পরিস্থিতি বিপ্লবের পক্ষে আরো বেশি অনুকূল হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব অর্থনীতি এখনো তীব্র সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে এবং বিশ্বের সমস্ত মৌলিক অসঙ্গতিগুলি শাণিত হচ্ছে। ফলে, সাম্রাজ্যবাদ ও এর গৃহপালিত সমর্থকদের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবী জুড়ে বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় মুক্তি বাহিনিগুলি শক্তি লাভ করছে। মাওবাদী বাহিনিগুলিও শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ভিত্তিগুলির আর কোনো অস্তিত্ব নেই এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মানসিক শক্তি খুবই দুর্বল। এটিও আমাদের সামনে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

 

পার্টি ও PLGA-এর একত্রীকরণের পর PLGA এর উন্নয়ন ও গেরিলা যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আমরা একটি গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। কিন্তু বর্তমানে সেখানে গতি হ্রাস পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

আপনার পর্যবেক্ষণ সঠিক। এই কারণে গত দশকে কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এবং এখানে গতি হ্রাস পাওয়ার যে পর্যবেক্ষণ করেছেন সেটিও সঠিক যেহেতু ২০১১ সাল থেকে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় কমিটি পরিস্থিতির একটি সার সংক্ষেপ করে এবং যাচাই করে দেখা যায় যে আমাদের আন্দোলন অত্যন্ত কঠিন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটি আমাদের বিভিন্ন গেরিলা জোনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটেছে। গত দশ বছরে অগ্রগতির পথটা বন্ধুর ছিল এবং আমাদের বিভিন্ন গেরিলা জোন পরবর্তীতে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন অমসৃণ পথ অতিক্রম করছে ঠিক তেমনি কেবল বিভিন্ন গেরিলা জোনগুলিই নয় বরং সারা দেশের বিপ্লবী আন্দোলন অমসৃণ পথ অতিক্রম করছে। এটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের একটি আইন। নিঃসন্দেহে, আমাদের মানসিক শক্তি গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতি ঘটায়, এবিষয়ে কোন মতবিরোধ থাকার কথা নয়।

অবশ্য, ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন গেরিলা জোনে গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতি ঘটেছে। একইভাবে, গেরিলা যুদ্ধের উত্থান পতনের ক্ষেত্রেও এই অবস্থাগুলি একটি ভিত্তি গঠন করে। এই বিষয়টা উপেক্ষা করলে আমাদের চলবে না। ২০১১ সাল থেকে বেশ কিছু রাজ্যের/গেরিলা জোনের মিলিটারি ফ্রন্টে গণ সংগ্রাম তৈরির ক্ষেত্রে ও আন্দোলন প্রসারের ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি। এই সময়কালে বিপ্লবী গণ কমিটিগুলিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে পার্টিকে সংহত করার মাধ্যমে কিছু গেরিলা জোনে আন্দোলনের উন্নয়ন ঘটেছিল। তারপরেও আমরা মন্দার মুখোমুখি হয়েছি। পার্টি এই মন্দার কারণগুলি চিহ্নিত করে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমগ্র পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলিকে সক্রিয় করে তুলেছে এবং এটিকে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখা উচিৎ।

অপারেশন গ্রিন হান্টের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে এবং মোদি নেতৃত্বাধীন NDA সরকার ক্ষমতায় আসার পর অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। কাজেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে এ সব কিছুই প্রচণ্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে এবং পাল্টা লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে করতে হয়েছিল। জল, জঙ্গল, ভূমি, ইজ্জত ও অধিকারের জন্য সংগ্রামরত মানুষের সমর্থনে ও অপারেশন গ্রিন হান্টের বিরুদ্ধে সমাজের যে সকল গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক মানুষ তীব্রভাবে সোচ্চার হয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন তাদেরকে পার্টি আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানায়। জনগণের লড়াকু শক্তিকে টেকসই করতে এটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০৯ সালের মধ্যভাগ থেকে এই বিপ্লব বিরোধী যুদ্ধের পাল্টা মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে বিপ্লবী বাহিনি ও বিপ্লব বিরোধী বাহিনির শক্তির ফারাকটা ছিল বিশাল। শত্রুর প্লাটুন পর্যায়ের বাহিনিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য কোম্পানি পর্যায়ে গেরিলা বাহিনিকে মোতায়েন করা হত। ব্যাটেলিয়ন পর্যায়ে গেরিলা বাহিনি শত্রুর কোম্পানি পর্যায়ের বাহিনিকে নিশ্চিহ্ন করতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতিতে, শত্রুরা প্রতিটি গেরিলা জোনে হাজার হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ বাহিনি মোতায়েন করল। সুতরাং, বিপক্ষ বাহিনির সঙ্গে শক্তির ফারাকের দরুণ আমাদের গেরিলা যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে নতুন কিছু প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হলো। আমাদের সশস্ত্র প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্যই যে কেবল শত্রুরা এত বিপুল সংখ্যক বাহিনি মোতায়েন করল তা নয়, বরং একই সঙ্গে এই দশকে ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম, লালগড়, নারায়ণপাটনায় এবং প্রায় সব গেরিলা জোনেই যে গুরুত্বপূর্ণ গণ আন্দোলনগুলি গড়ে উঠেছিল সেগুলিকে দমন করার জন্যেও এই বিপুল সংখ্যক বাহিনি মোতায়েন করা হয়েছে। এভাবে, এই অধঃপতিত ব্যবস্থার একটি বিকল্প হিসেবে মাওবাদী আন্দোলন প্রকাশিত হলো। আমাদের গতিতে যে মন্দা দেখা দিয়েছে তাকে কেবল শত্রুর দমন নিধনের ফলাফল হিসেবে দেখলে হবে না পাশাপাশি একে আমাদের নিজেদের দুর্বলতার বিপর্যয় হিসেবেও দেখতে হবে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য আমরা আমাদের ভুলগুলি ও দুর্বলতাগুলি চিহ্নিত করেছি এবং পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলির বলশেভিকীকরণের কাজ হাতে নিয়েছি।

একই সঙ্গে, এই পরিস্থিতির পিছনে যে বাহ্যিক শর্তগুলি কাজ করেছে সেগুলিও আমাদেরকে দেখতে হবে। আগের ধাপে শত্রুর আক্রমণের পাল্টা মোকাবেলা হিসেবে আমরা কিছু কৌশল অবলম্বন করেছিলাম যেগুলি কিছুটা সাফল্য পেয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় শত্রুরা এই কৌশলগুলির পাল্টা কিছু কৌশল গ্রহণ করে। ফলে নতুন একটি পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সুতরাং, আমাদেরকে আবারো কিছু কৌশল গ্রহণ করতে হবে যেগুলি গেরিলা যুদ্ধে শত্রুর সর্বোচ্চ বাহিনিকে মোকাবেলা করতে আমাদেরকে সাহায্য করবে এবং জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। গেরিলা যুদ্ধ গড়ে তোলা ও অগ্রগতি ঘটানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো গণভিত্তিকে মজবুত করা। আন্দোলনের উত্থান ও পতনের যে প্রক্রিয়া সেটি নতুন নতুন পরিস্থিতির জন্ম দেয়। এটি বোঝার ক্ষেত্রে এবং পার্টি, PLGA ও জনগণকে এর জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে পার্টির দিক থেকে কিছু গুরুতর ভুল হয়েছে। নতুন চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে পার্টির ত্রুটির কারণে ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে একটি শক্তিশালী শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে ক্ষয়ক্ষতি ও অবস্থার অবনতি ঘটেই থাকে।

এই কারণে মাও বলেছিলেন জয়-পরাজয়-জয়-পরাজয় ও সবশেষে জয় এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ এগিয়ে যাবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ সবসময় একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও আংশিক সাফল্য ও কিছু বড় ধরনের সাফল্য ও অগ্রগতির পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে কিছু ক্ষুদ্রক্ষুদ্র ও আংশিক ক্ষতি, পরাজয় ও কিছু বড় ধরনের ক্ষতি ও পশ্চাদপসরণ থাকে। এটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের একটি নিয়ম যে এটি আঁকাবাঁকা ভাবে চলে। কাজেই গেরিলা যুদ্ধের গতি হ্রাস হবার ঘটনাকে আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। প্রয়োজনীয় কৌশল গ্রহণ করার অর্থ এটাই দাঁড়ায়। আমাদের দেশের বিভিন্ন অংশে আন্দোলন যে বন্ধুর পথে এগিয়ে যাচ্ছে সেটিকে মাথায় রেখে আমাদের কাজের স্থানগুলির বাস্তব অবস্থার পরিবর্তন অনুযায়ী আমাদেরকে হয় আত্মরক্ষার কৌশল অথবা আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিকে কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে বিপ্লবী যুদ্ধের সামগ্রিক পরিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে একে বিবেচনা করতে হবে।

শুধু বিভিন্ন অংশেই নয়, একটি গেরিলা জোনের ভিতরেও সেই নির্দিষ্ট গেরিলা জোনটির বিশেষত্ব অনুযায়ী আমাদেরকে আক্রমণাত্মক কিংবা আত্মরক্ষার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। কিছু এলাকায় যদি অবস্থা একটু ভালও হয়, তাহলেও সামগ্রিকভাবে যে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা আমাদের করতে হচ্ছে তাকে কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। এবং আমরা সকলে জানি যে আত্মরক্ষার মধ্যে সবসময় আক্রমণ নিহিত থাকে এবং আক্রমণাত্মক না হয়ে কোন আত্মরক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যে কৌশলই গ্রহণ করি না কেন, সকল পর্যায়ের নেতৃত্বকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী। নতুন পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আমাদের পার্টিতে যে দুইটি বিচ্যুতি দেখা দিতে পারে তা হলো—

১. শত্রুর আপাত শক্তিমত্তা ও তীব্রতার প্রতি দৃষ্টি আরোপ করা এবং তাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলিকে চিহ্নিত না করা; নিজেদের শক্তিমত্তা, সুবিধা ও বিপ্লবী যুদ্ধে জনগণের প্রভাবশালী ভূমিকার দিকে দৃষ্টি আরোপ না করা; শত্রুর বৃহৎ কৌশলকে না বুঝে কেবল শত্রুর ক্ষুদ্র কৌশলের প্রতি দৃষ্টিপাত করা। এর ফলে কমরেডগণ আত্মরক্ষার নামে কাজ করার উদ্যম হারিয়ে ফেলে অক্রিয় হয়ে পড়বে এবং শেষে লড়াকু শক্তি হারিয়ে ফেলবে। এটি হলো ডান বিচ্যুতি।

২. গেরিলা যুদ্ধে লড়াইয়ের দিকগুলিতে যে পরিবর্তন ঘটেছে তাকে না বোঝা এবং আত্মরক্ষা তথা নেতৃত্বকে রক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার দুর্বলতা, জনগণের অক্রিয়তাকে বিবেচনায় না রেখে আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করা। তারা শত্রুকে ক্ষুদ্র কৌশলগত দিক থেকে দেখে না, তারা শত্রুকে কেবল বৃহৎ কৌশল দ্বারা যাচাই করে। এটি একটি বাম বিচ্যুতি।

কাজেই, আমাদের গেরিলা যুদ্ধের গতি বৃদ্ধি করতে হলে দেশের সামগ্রিক সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যে পরিবর্তনগুলি ঘটছে সেগুলি জানার পাশাপাশি বিপ্লবী যুদ্ধে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলি জানতে হবে এবং শত্রুর ও নিজেদের শক্তিমত্তার ও দুর্বলতার জায়গাগুলি জানতে হবে। এটি একটি অন্যতম প্রধান বিষয় যেটি আমরা বলশেভিকীকরণের মধ্য দিয়ে অর্জন করার চেষ্টা করছি। জয়লাভ করতে হলে গণভিত্তি বৃদ্ধি করা, জনগণকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে প্রচেষ্টা চালানো, গেরিলা যুদ্ধ ও গণযুদ্ধের সমস্ত কর্মকাণ্ডে তাদের সক্রিয় ভূমিকা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরী। কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিটি ও সকল পরিচালনা কমিটি বর্তমানে এই বিষয়টিকে বুঝে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে।

 

পার্টির অধিকাংশ কার্যক্রম আদিবাসী এলাকায় সীমাবদ্ধ; এটি নিয়ে পার্টির শুভাকাঙ্ক্ষীরাও চিন্তিত। কেউ কেউ বলছেন যে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ কেবল এই ধরনের এলাকার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, গোটা ভারতের জন্য প্রযোজ্য নয়। এ বিষয়ে আপনার উত্তর কী? সারা দেশে আপনারা কীভাবে গণযুদ্ধকে ছড়িয়ে দেবেন?

ভারত একটি বৃহৎ আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী রাষ্ট্র যার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন বন্ধুর পথে এগুচ্ছে। এই বন্ধুর অবস্থার ফলে দেশ জুড়ে যুগপৎ সশস্ত্র বিপ্লবের লাইন বাতিল হয়ে যায়। আমাদেরকে অবশ্যই গ্রামাঞ্চলের পশ্চাৎপদ এলাকাগুলিতে নিজেদের ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ যেখানে সামাজিক অসংগতিগুলি অনেক বেশি তীব্র, তুলনামূলকভাবে সেই সব অধিকতর পশ্চাৎপদ এলাকায় বিপ্লবী যুদ্ধকে দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সুতরাং, বিপ্লবী আন্দোলন কেবল দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ ধরেই অগ্রসর হতে পারে। ওপরন্তু শাসক শ্রেণির কাছে রয়েছে একটি শক্তিশালী দমনমূলক যন্ত্র আর তা হলো একটি ক্ষমতাশালী কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র ও এর সঙ্গে একটি সুপ্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত আধুনিক আর্মি।

কাজেই শত্রুর শাসনের দুর্বলতম সংযোগ রয়েছে যে সকল স্থানে সেখানে আমাদেরকে বিপ্লবী যুদ্ধ চালনা করতে হবে; উদাহরণস্বরূপ গ্রামাঞ্চলে। আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং চীন, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ইত্যাদি দেশের ইতিহাস আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশগুলিতে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইনের যথার্থতাকে প্রমাণ করে সন্দেহাতীতভাবে। এদেশে মুক্ত এলাকা ও লাল বাহিনি গঠন করা সম্ভব নয় এবং দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় এসব বিষয় নিয়ে যে তর্কবিতর্ক চালু আছে তা নতুন নয়। শাসক শ্রেণি ও বুদ্ধিজীবীরা, সংশোধনবাদী সংসদীয় ‘বাম’রা এবং ছদ্ম ML পার্টি; এরা সকলেই দীর্ঘদিন ধরে এ জাতীয় তর্ক বিতর্ক চালিয়ে আসছে। বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক শক্তি যারা গণযুদ্ধে জড়িত, তাদের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করার উদ্দেশ্যে তারা এ ধরনের কথা বলে। ওপরন্তু, যে সকল বাম দল দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথকে প্রত্যাখান করেছে তারা তাদের দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে সমাজকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে কিছুই করতে সমর্থ হয়নি।

মূলত, তারা সবসময় এ ধরনের রূপান্তরের বিপক্ষে থেকে সংসদীয় ডোবায় নিমজ্জিত হয়ে আছে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের বিপক্ষে এই ভ্রান্ত বক্তব্যের একটি ভিন্ন ধরনের দাবী হলো দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ কেবল আদিবাসী এলাকাতেই প্রযোজ্য, দেশের বাকি এলাকাগুলিতে প্রযোজ্য নয়। এই বক্তব্যটিও অন্তঃসার শূন্য। শত্রুদের এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে ভারতীয় বিপ্লবের শুভাকাঙ্ক্ষীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পৃথক করে দেখতে হবে। বিপ্লবের শুভাকাঙ্ক্ষীরা আন্দোলনের অধিকাংশ কার্যক্রমের আদিবাসী এলাকায় সীমাবদ্ধতা নিয়ে চিন্তিত। এটা সত্যি যে মধ্য ও পূর্ব ভারতের বিশাল অরণ্য এলাকায় যে এলাকাগুলি আদিবাসী জনগণের বাসভূমি, সেখানে আজ আমাদের আন্দোলন তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। দণ্ডকারণ্য ও বিহার-ঝাড়খণ্ড জোনকে কেন্দ্রে রেখে গত এক দশকে আন্দোলন অগ্রসর হয়েছে। সমতলের বিভিন্ন এলাকায় কীভাবে আন্দোলনের উন্নয়ন ঘটানো যায় সে বিষয়ে পরিস্কার দৃষ্টিকোণ রয়েছে এবং ‘Strategy and Tactics of Indian Revolution’ নামে আমাদের যে দলিলটি রয়েছে তাতে কৌশলগত নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে।

শহরে কাজের জন্য আমাদের একটি নীতিমালাও রয়েছে। তারপরেও গ্রামীণ সমতলে ও শহরাঞ্চলে আমাদের আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো নির্দেশনা অনুযায়ী ক্যাডারদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আমাদের ত্রুটি। এই দুটি এলাকার (গ্রাম ও শহর) বৃহৎ কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবনের ক্ষেত্রে এবং সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনগুলিকে বিশ্লেষণ করার জন্য সামাজিক তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ফলশ্রুতিতে, আমরা অনেক নেতৃত্বকে হারিয়েছি যারা শত্রুর সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল এবং এই এলাকাগুলিতে আন্দোলনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। দেশের বিশাল সমতল কৃষি এলাকায় আমাদের ক্ষীণ উপস্থিতির পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো আমরা কৃষকদেরকে বিশেষত কৃষি শ্রমিক ও দরিদ্র কৃষকদেরকে গেরিলা যুদ্ধে বিশদভাবে সংগঠিত করতে পারিনি। একইসঙ্গে, অরণ্য ঘেরা আদিবাসী এলাকার নব্য উদ্ভাবিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি সহ কৃষক শ্রেণির বাইরে অন্যান্য শ্রেণিকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে আমাদের ত্রুটি ছিল; আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ার এটিও একটি কারণ।

আমাদেরকে অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না যে এধরনের এলাকায় কাজ করার ফলে বিপ্লবী আন্দোলন প্রভূত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। দুই পার্টির একত্রীকরণের পর গত দশক থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা আমাদেরকে যথাযথ শিক্ষার একটি চিত্র তৈরি করতে ও আমরা যেখানে বাধার সম্মুখে আছি সেখানে আন্দোলনকে পুনরায় গঠন করতে, যেখানে আমরা দুর্বল হয়ে পড়েছি সেখানে শক্তির যোগান দিতে ও আমরা যে এলাকায় নেই সেখানে আন্দোলনকে সম্প্রসারণ করতেও সাহায্য করবে। কলিঙ্গনগর, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড়, নারায়ণপাটনায় গণমানুষের বিদ্রোহ ও তেলেঙ্গানায় পৃথক রাজ্য আন্দোলন ইত্যাদি থেকে আমাদেরকে অবশ্যই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে; এইসব আন্দোলন গ্রাম ও শহরাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী ও দেশীয় দালালদের আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শোষণ ও নিপীড়নের দাসত্বের নিচে থাকা জনগণের একটা বড় অংশ বিশাল গ্রামাঞ্চল ও আদিবাসী এলাকার বাইরে অবস্থিত শহরাঞ্চলে বসবাস করে।

লড়াই ছাড়া সমস্যা সমাধানের আর কোন বিকল্প তাদের নেই। চলমান গণযুদ্ধ তাদের ওপর প্রভাব রাখছে। সুতরাং, এই এলাকাগুলির অবস্থা বিপ্লবী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনুকূল। বাস্তব অবস্থা ও বিভিন্ন শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের জনগণের চাহিদার কথা মনে রেখে আমাদেরকে সৃষ্টিশীলভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক-মিলিটারি লাইনের প্রতি দৃঢ়ভাবে অবিচল থেকে, সুবিশাল অভিজ্ঞতার আলোকে পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে কাজ করে, অতীতের ভুলগুলিকে সংশোধন করে, পরিবর্তিত অবস্থা ও শত্রুর কৌশলের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সঠিক কৌশল কাজে লাগিয়ে এই এলাকাগুলিতে জনগণকে সংগঠিত করে শ্রেণি সংগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা চমৎকার সব অবজেকটিভ কন্ডিশনগুলির সদ্ব্যবহার করতে সমর্থ হব এবং গেরিলা যুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। এভাবে, গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে।

 

সরকার দাবী করছে তাদের উন্নত আত্মসমর্পণ নীতিমালা মাওবাদীদের মাঝে সাড়া ফেলেছে এবং তারা আত্মসমর্পণ করছে। সত্যটা কী?

আত্মসমর্পণ নীতিমালা বলতে তারা কী বোঝায়? আপাতদৃষ্টিতে তারা বোঝায় আরো অর্থ, আরো পুনর্বাসন প্যাকেজ। এগুলি জনসাধারণকে বোঝানোর জন্য। বেশি অর্থ বা ভালো পুনর্বাসনের কারণে আত্মসমর্পণ বৃদ্ধি পায়নি। এর দুটো কারণ আছে। অধিকারের জন্য লড়াইরত আদিবাসীদের ধ্বংস করে দেয়ার ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের নৃশংসতম সরকারগুলির মধ্যে একটি আর তারা যদি সিপিআই (মাওবাদী) এর অধীনে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তাদের ওপর যে পরিমাণ নিষ্ঠুরতার বোঝা চাপানো হয় তা ভাষায় বলে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সাম্রাজ্যবাদপন্থী নীতিমালা বিরোধী প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দিতে রাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের দমনমূলক পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে আর আত্মসমর্পণ নীতিমালাও তার মধ্যে একটি।

কেউ বিপ্লবী কার্যক্রমে জড়িত হোক আর না হোক, যেসব এলাকায় আন্দোলন চলছে সেসব এলাকায় রাষ্ট্রীয় বাহিনি রক্তপায়ী নেকড়ের মতো জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তবে এর প্রধান লক্ষ্যবস্তু তারা, যারা প্রতিরোধ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত; তাদের ওপর ভয়ংকর নির্যাতন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি ধ্বংস, মনস্তাত্বিক যুদ্ধ, হুমকি (পঙ্গু বা হত্যা করার হুমকি এবং বাস্তবে তা করা) ইত্যাদি সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করে তাদের অনেককে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হচ্ছে। গণ আত্মসমর্পণের পিছনে এটাই দায়ী আর পুলিশ একে গণমাধ্যমের সামনে উন্মত্ততার সঙ্গে ও উদ্ধতভাবে তুলে ধরছে। তিন চতুর্থাংশের বেশি আত্মসমর্পণ এই শ্রেণির। আর অন্য ধরনের আত্মসমর্পণ যারা করে তারা হলো পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনের কিছু ব্যক্তি যারা শত্রুর কাছে নতজানু হচ্ছে। হ্যাঁ, সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের আত্মসমর্পণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে যাদের ভেতর নেতৃত্ব পর্যায়েরও (রাজ্য কমিটি, জেলা কমিটি ও এলাকা কমিটি পর্যায়ের) কয়েকজন রয়েছে।

শত্রু যখন নতুন ভাবে আক্রমণ চালায় এবং নিষ্ঠুর দমন পীড়ন যখন নজীরবিহীন পর্যায়ে চলে যায়, তখনই নতুন ধরনের আত্মবলিদানের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই ধরনের সময় যখন যায় তখন সবসময় কিছু দুর্বল উপাদান থাকে যারা আন্দোলন ত্যাগ করে চলে যায় কিংবা শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এখনও তাই ঘটছে। সরকারের কথিত উন্নত আত্মসমর্পণ নীতিমালার কিছু প্রভাব হয়তো পড়েছে। কিন্তু তা খুবই নগন্য এবং এটা কখনো কারণ হতে পারে না। এই ধরনের আত্মসমর্পণের প্রথম কারণও হলো শত্রুর নৃশংস হামলা। শুধু তাই না, আত্মসমর্পণের পরেও শ্রেণি ও পারিবারিক পটভূমি অনুযায়ী রাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে ভিন্নভাবে দেখছে। কিন্তু তাদের সকলকে জনগণের কাছে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে হাজির করার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে কোন ভিন্নতা নেই। তাদের কাছ থেকে তথ্য আদায় করতে রাষ্ট্র সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করছে, তাদেরকে ভাড়াটে কর্মী হিসেবে ব্যবহার করছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে আরো ভয়ংকর হামলায় তাদেরকে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করছে। সুতরাং, যারা সরলভাবে মনে করছে যে ‘মূলধারায়’ ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে, একটা ‘সুন্দর জীবন’ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য রাষ্ট্র আত্মসমর্পণ নীতিমালা গ্রহণ করেছে, তাদের বোঝা উচিৎ যে ‘জনগণের ওপর যুদ্ধ চালানোর’ একটি অংশ ছাড়া আত্মসমর্পণ আর কিছুই নয়। এর লক্ষ্য হলো আন্দোলনকে দুর্বল করে দিয়ে তাদেরকে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত করে যুদ্ধকে তীব্রতর করা।

আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় কারণ হলো কিছু ব্যক্তি শত্রুর দমননীতির গতি প্রকৃতি এবং আন্দোলনের কিছু ক্ষণস্থায়ী ক্ষয়ক্ষতি বুঝতে সক্ষম হচ্ছেনা; ফলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। কারো কারো ব্যক্তিগত দুর্বলতাও আরেকটি কারণ। এই সমস্যাগুলির সমাধান হলো- সকল পর্যায়ের ক্যাডারদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রতিশ্রুতি গড়ে তুলতে হবে, শত্রুর মনস্তাত্বিক যুদ্ধের বিপরীতে আরো দুরূহ লড়াই চালাতে হবে এবং ক্যাডারদের বোঝাতে হবে আত্মসমর্পণ করার অর্থ নিজেদের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা, কাজেই এটা কোন সমাধান নয়। পার্টির বর্তমান বলশেভিকীকরণ প্রচারণায় এই বিষয়টি নিয়েও কাজ চলছে। আর যে বিষয়টি আমি জোর দিয়ে বলতে চাই তা হলো অপারেশন গ্রিন হান্টের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে বিপ্লবী ক্যাডার ও জনগণের অতুলনীয় আত্মবলিদানের ঘটনা ঘটেছে কারণ প্রথমত, জনগণ তাদের অপরিহার্যতা উপলব্ধি করেছে ও দ্বিতীয়ত, তারা উঁচু মাপের সচেতনতার মধ্য দিয়ে এই আত্মবলিদানের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছে।

মনস্তাত্বিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবে শত্রুরা নিশ্চিতভাবেই কেবল আত্মসমর্পণকে সামনে তুলে ধরবে এবং আত্মত্যাগকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করবে। বিপ্লবী প্রচারণা যুদ্ধে এই বিষয়টিকে কার্যকরীভাবে আমাদের তুলে ধরতে হবে। যতদিন বিপ্লবী যুদ্ধ চলবে, ততদিন রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চলবে। সুতরাং, যতদিন পর্যন্ত এই বর্বর শাসন ব্যবস্থা উৎখাত না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত কিছু আত্মসমর্পণ ঘটবে আর কিছু সময়কালে এর সংখ্যা কম বেশি হতে পারে। সমগ্র পার্টি ও আন্দোলন চলমানরত সব এলাকায় বিপ্লবের স্বার্থে স্বেচ্ছায় আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়েই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ সহ সকল পর্যায়ের আত্মত্যাগের ঘটনাগুলি ঘটেছে এবং যে কোন বিপ্লবের জন্য এগুলি অপরিহার্য।

 

পার্টি বলশেভিকীকরণ প্রচারণার প্রয়োজন বোধ করল কেন? এটা থেকে আপনারা কী ধরনের ফলাফল আশা করছেন?

২০১৩ সালে পার্টির ভেতরে বলশেভিকীকরণ প্রচারণা চালানোর আহ্বান জানায় আমাদের পার্টি এবং বর্তমানে পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলিতে এই প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়া সমাপ্ত হতে আরো সময় লাগবে আর কেবল তখনই যাচাই করা সম্ভব হবে বলশেভিকীকরণের মাধ্যমে পার্টিকে নতুনভাবে গঠন করার কাজ কতটুকু সফল হলো। রাশিয়ান বলশেভিক পার্টি নামে পরিচিত CPSU(B) বিশ্বে প্রথমবারের মতো বুর্জোয়া শ্রেণিকে উৎখাত করে প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব কায়েম করে। যেসময় বিশ্বে কোন কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসেনি সেসময় এই পার্টি মেহনতি ও শ্রমজীবী জনতাকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। মানব ইতিহাসে বলশেভিক পার্টি সর্বপ্রথম সমাজতন্ত্রের সূচনা ঘটায়। সুতরাং এই পার্টিকে আমরা মডেল হিসেবে গ্রহণ করছি এবং এর থেকে শিক্ষা নিয়ে এর বৈশিষ্ট্যসমূহকে আত্মস্থ করে আমাদের পার্টিকে এরকম একটি প্রলেতারিয়েত পার্টিতে রূপান্তরের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। এই কারণে আমরা এর নাম দিয়েছি বলশেভিকীকরণ প্রচারণা (Bolshevisation Campaign)।

অন্যদিকে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (CPC) মডেলটিও আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ একটি আধা ঔপনিবেশিক, আধা সামন্তবাদী পশ্চাদপদ কৃষি প্রধান দেশে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইনের উন্নতি ঘটিয়ে, একটি জনতার বাহিনি ও একটি সফল যুক্তফ্রন্ট গঠন করে মুক্তাঞ্চল স্থাপনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি একটি সফল বিপ্লব ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিল। সুতরাং CPC এর বৈশিষ্ট্যগুলি জানা ও সেগুলি আত্মস্থ করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ চীন ও ভারতের মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। গঠিত হবার পর থেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (CPC) রাশিয়ান বলশেভিক পার্টি CPSU(B) কে মডেল ধরে নিজেদের শক্তিশালী করে গড়ে তোলার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে গেছে। তাই এই পার্টির অভিজ্ঞতাকে মনে রেখে বিশেষ করে মহা বিতর্ক (Great Debate ) ও মহান প্রলেতারিয়েত সাংস্কৃতিক বিপ্লব থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার আলোকে আমরা এই প্রচারণা চালিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমরা এই দুটি পার্টিকে আমাদের মডেল হিসেবে গ্রহণ করে পার্টির বলশেভিকীকরণের প্রচেষ্টা চালাব কিন্তু তা হবে আমাদের পার্টির দীর্ঘ বিপ্লবী ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে।

এই প্রচারণা চালানোর কারণগুলি হলো—

১. দেশব্যাপী শত্রুর হামলার ভেতরে পরিবর্তন ঘটেছে। আক্রমণ তীব্রতর হয়েছে;

২. পার্টিতে বেশ কিছু বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে এবং বর্তমানে আন্দোলন অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে।

৩. পার্টিতে কৃষক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কমরেডদের সংখ্যা বেশি; এই কারণে পার্টিতে প্রলেতালিয়েত দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

৪. সমাজে ও বিপ্লবী যুদ্ধে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, সে অনুযায়ী যথাযথ কৌশল পর্যালোচনা ও গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমাদের ত্রুটি; এবং

৫. পার্টির ভেতরে বড় ধরনের কিছু অপ্রলেতারিয়েত ধারার অস্তিত্ব রয়েছে।

এই বিষয়গুলিকে মনে রেখে এই চ্যালেঞ্জগুলিকে মোকাবেলা করার লক্ষ্যে ও সাংগঠনিকভাবে পার্টিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পার্টিতে মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক মানের উত্তরণের জন্য আমরা বলশেভিকীকরণ প্রচারণা গ্রহণ করেছিলাম। এর মাধ্যমেই কেবল পার্টি PLGA কে একটি ক্ষমতাশালী অস্ত্রে পরিণত করতে পারবে এবং আন্দোলনের গণভিত্তিকে মজবুত করতে পারবে। আর এর মধ্য দিয়েই কেবল বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিকে অতিক্রম করে আমরা সামনে এগোতে পারব। কিছু বাস্তব লক্ষ্য অর্জন করার জন্য আমরা এই প্রচারণাকে পরিকল্পতিভাবে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এই লক্ষ্যগুলি অর্জন করার মাধ্যমে আমরা কিছু ফলাফল আশা করছি। এই প্রচারণা বিশ্ব প্রলেতারিয়েত দৃষ্টিভংগির মাধ্যমে পার্টিকে পুনরায় গঠন করবে এবং পার্টির অভ্যন্তরে বিশেষ করে নতুনদের ভেতরে একে প্রসারিত করবে।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের অধ্যয়নকে বর্ধিত করে সমগ্র পার্টিকে এবিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে এটি সম্ভব হবে। এর ফলে সমগ্র পার্টি, পার্টির প্রতিটি ইউনিট নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্য সম্পর্কে একটি পরিস্কার ধারণা পাবে এবং বর্তমান সংকট মুহূর্তে যেসমস্ত বাস্তব লক্ষ্যসমূহ অর্জন করতে হবে সেগুলি পরিস্কারভাবে বুঝতে সমর্থ হবে। এর মাধ্যমে মাও নির্দেশিত কাজ করার তিনটি কৌশল গভীরভাবে বোঝা সম্ভবপর হবে এবং এতে করে আমাদের কাজ করার ধরন উন্নত হবে। গোপন পার্টির গঠন ও কার্যক্রম সম্পর্কে এটি আমাদের ধারণা বৃদ্ধি করবে; যে সমস্যাগুলি দেখা দিচ্ছে সেগুলি দ্রুত সমাধান করতে সাহায্য করবে এবং গেরিলা যুদ্ধ সচল রাখার মূলনীতিগুলির বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। পার্টির ভেতরে চলমান অপ্রলেতারিয়েত ধারাকে সংশোধন করে এরর বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর লক্ষ্যে পার্টির ভেতরে সচেতনতা ও সতর্কতা বৃদ্ধি করবে।

এর মাধ্যমে চিন্তা, কাজ ও শৃঙ্খলার ঐক্য মজবুত হবে ও বৃদ্ধি পাবে। ফলশ্রুতিতে, জনগণের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সংহতি স্থাপন এবং তাদেরকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য সংগ্রামে সংগঠিত করার মাধ্যমে পার্টির গণভিত্তি শক্তিশালী হবে। কৃষি বিপ্লবে কৃষকদেরকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করে কৃষক ছাড়াও অন্যান্য জনগণ ও শহরের জনগণের মাঝে বিশেষ তৎপরতা চালানোর ক্ষেত্রেও এটি নেতৃত্ব দেবে। এর ফলে পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা বিষয়ে জানাবোঝা্র ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে ও সে অনুযায়ী কৌশল পরিবর্তন করতে হবে; এভাবে সফলতার সঙ্গে আন্দোলনের অগ্রগতি ঘটবে। আমরা আশা করছি এই প্রচারণা আমাদের কমরেডদেরকে দৃঢ় করে তুলবে যাতে করে বিপ্লবের পথ ধরে আসা কঠিনতম পরিস্থিতি ও ঝুঁকি মোকাবেলা করার মতো সচেতনতা তারা প্রদর্শন করতে পারে এবং প্রাণপণে শত্রুর সঙ্গে লড়াই চালানোর লক্ষ্যে তাদের প্রস্তুতিকে তীব্রতর করতে পারে। আর সব শেষ যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তা হলো, আমরা আশা করছি এর মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বকে এবং আন্দোলনকে শত্রুর নিষ্ঠুরতম আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হব। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদকে এই প্রচারণার কেন্দ্রে রেখে এবং গভীরভাবে আঁকড়ে ধরার মধ্য দিয়ে এতক্ষণ যেসকল ফলাফলগুলির কথা উল্লেখ করা হলো সেগুলি অর্জন করা সম্ভব হবে।

 

শত্রুরা প্রচার করছে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইন সেকেলে। কেউ কেউ শাভেজের একুশ শতকের সমাজতন্ত্রকে সমর্থন করছে। প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোট নেতৃত্বাধীন ইউসিপিএন (মাওবাদী) UCPN (Maoist) দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইন ত্যাগ করে সংসদীয় পথ বেছে নিয়েছে। ভারত ও বর্তমান বিশ্বায়নের পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। এইসব তর্ক বিতর্ক সম্পর্কে পার্টির বক্তব্য কী?

যখন থেকে মার্কস ও এঙ্গেলস প্রলেতারিয়েত মতাদর্শ প্রস্থাপন করেছেন এবং সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী শক্তি হিসেবে শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে তখন থেকে বিশেষ করে প্যারি কমিউনে প্রলেতারিয়েত বিপ্লবের পর থেকে শুধু আমাদের দেশেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য স্থানেও শোষক ও প্রতিক্রিয়াশীলেরা সবসময় মার্কসবাদ ও বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। রাশিয়া আর চীন যখন সংশোধনবাদীতে পরিণত হলো, তখন তারা প্রচার করতে আরম্ভ করল যে মার্কসবাদ সেকেলে। কারণটা বলাই বাহুল্য। বিপ্লব ও মার্কসবাদ তাদের ধ্বংস বয়ে আনবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইন কী করে সেকেলে হতে পারে? মাও এর মৃত্যুর পর পৃথিবীতে যত নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব কিংবা জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে সেগুলি সবই ছিল দীর্ঘস্থায়ী।

এসব যুদ্ধের কোন কোনটাতে বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা যুদ্ধ ত্যাগ করার ঘটনা ঘটলেও এই সবগুলি যুদ্ধই ছিল দীর্ঘস্থায়ী। যতদিন পর্যন্ত আধা সামন্তবাদী কাঠামো মৌলিকভাবে পরিবর্তিত না হবে এবং যতদিন আমাদের দেশের মত দেশগুলিকে সাম্রাজ্যবাদ এর মুঠোর মধ্যে রেখে স্বনির্ভর উন্নয়ন ঘটাতে বাধা দান করবে ততদিন পর্যন্ত এই দেশগুলির জন্য দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। সামন্তীয় কিছু রূপ বদলালেও সামন্তবাদ একইরকম থাকবে কারণ এটি সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া বেনিয়াদের স্বার্থকে রক্ষা করে। এ কারণে, একটি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, সামন্তবাদ বিরোধী নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের লক্ষ্যে পার্টির অধীনে জনগণ দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যই নির্ধারণ করে দেয় যে এটি হবে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যেটি আমাদের পার্টির নেতৃত্বে জনগণ চালাবে। সুতরাং, আমি ইতোমধ্যে বলেছি ভারতের মত একটি দেশে একটি সফল বিপ্লব ঘটানোর জন্য দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইনকে আমরা কেন অপরিহার্য বলে মনে করি। এখন শাভেজ এবং তার কথিত একুশ শতকের সমাজতন্ত্রের মডেল প্রসঙ্গে আসি।

এখনো পর্যন্ত পৃথিবীতে বিপ্লবের দুইটি পথ তৈরি হয়েছে; একটি হলো অভ্যুত্থান ও অপরটি হলো দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ। নিজ নিজ দেশের বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এই দুটি পথ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। নতুন ঐতিহাসিক অনুষঙ্গে এই দুটিতে পরিমার্জনও ঘটতে পারে। মার্কসবাদ এটাই বলে যে, যান্ত্রিকভাবে বা অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে নয় বরং সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে বিপ্লব ঘটাতে হয়। কিন্তু যে ধরনের পরিমার্জনই হোক না কেন, তা হতে হবে বিপ্লবের আওতার মধ্যে। এই কারণে বিপ্লব আবশ্যকীয়। অবশ্য, তা হতে হবে একটি নির্দিষ্ট দেশের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। একটি শ্রেণিহীন সমাজের দিকে যাওয়ার জন্য কোন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যতীত অবক্ষয়প্রাপ্ত একটি সমাজ ব্যবস্থাকে সংশোধন করার প্রচেষ্টা বৃথা।

শাভেজের মডেল কোনো বিপ্লবের মডেল নয়, এটি নিছক সংশোধনবাদী মডেল। কাঠামো বা উপাদান কোন দিক থেকেই এটি সমাজতন্ত্র নয়। রুশ ও চীনা বিপ্লবের পর পৃথিবীতে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটেছে। পুঁজিবাদী ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে ক্ষুদে বুর্জোয়া গোষ্ঠী অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের একটি অংশ উদার বুর্জোয়া আদর্শ ধারণ করে ও অপর অংশটি ইউটোপিয় সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ধারণ করে। যেসব দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব কিংবা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়নি, যেখানে বিপ্লবী আন্দোলন সে দেশের জনগণকে এর আওতায় নিয়ে আসতে পারেনি, সেসব দেশের ক্ষুদে বুর্জোয়াদের অধিকাংশই বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থার ভেতরে কিছু পরিবর্তন বা সংশোধন প্রত্যাশা করে। ভেনেজুয়েলার শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষকদের স্বার্থে শাভেজ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তাদের প্রধান পণ্য তেল। যদিও তেল ও অন্যান্য কিছু শিল্প জাতীয়করণ হয়েছে তারপরেও নিশ্চিতভাবেই সামন্তবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী বেনিয়াদের নিশ্চিহ্ন করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে তারাও আলাদা নয়, সুতরাং, ব্যবস্থায় কোন মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য থেকে তারা পরিপূর্ণভাবে স্বাধীন নয়। ভেনেজুয়েলার সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী বেনিয়াদের একটি অংশ এত বেশিমাত্রায় গরীবদের বিরোধী যে তারা এই জাতীয় সংশোধনেরও প্রচণ্ড বিরোধী। আর এটি শাপে বর হয়ে দেখা দিচ্ছে কারণ জনগণের নানা অংশ থেকে শাভেজের মডেলের জন্য এটি বৃহৎ পরিসরে প্রচারণা পাচ্ছে। তিনি কখনো জনগণকে শ্রেণি সংগ্রামে সংগঠিত করেননি। শাভেজ বলিভার ও চে গুয়েভারার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন কিন্তু তার মডেল হলো মাইনাস বলিভারিজম এবং মাইনাস চে গুয়েভারাইজম। এটি মূলত সংশোধনবাদ এবং এই কারণে আমাদের দেশে দেউলিয়া হয়ে পড়া সিপিআই ও সিপিআই(এম) শাভেজের এই মডেলের ওপর গুরুত্ব আরোপ করছে। ঐক্যবদ্ধ পার্টিতে থাকাকালীন তারা নেহেরুভিয়ান সমাজতন্ত্রকে উর্ধ্বে তুলে ধরে বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।

নেপালে আধা সামন্তবাদের ওপর ভিত্তি করে সাম্রাজ্যবাদের জোয়ালের নিচে সংসদীয় ব্যবস্থা টিকে আছে; নেপালের ওপর এক দিকে রয়েছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের আধিপত্য ও অন্যদিকে রয়েছে চীনের প্রভাব। যে কেউ এখানে যোগদান করবে তাকেই বিপ্লব ত্যাগ করতে হবে। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বেশ ভাল সাফল্য সত্ত্বেও UCPN (Maoist) এর প্রচণ্ড-ভট্টরায়ের আধুনিক সংশোধনবাদী জোট এই পথ বেছে নিয়েছে। লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ ও হাজার হাজার শহীদের সঙ্গে তারা স্রেফ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। পূর্ববর্তী সব সংশোধনবাদীদের মতো শাসক শ্রেণির সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির উদ্দেশ্যে নিজেদের স্বার্থে তারা এই কাজ করেছে। আমরাও স্বীকার করি যে বিশ্বায়নের ফলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু কাদের জন্য এই পরিবর্তনগুলি ঘটানো হয়েছে? পুঁজিবাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের স্বার্থ কায়েমের জন্য এই পরিবর্তনগুলি ঘটানো হয়েছে। গত ২৩ বছরে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এইসব পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

আর এটি পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির শাসকশ্রেণির একটি অংশকে শ্রমিক, মেহনতি জনসাধারণের ওপর অপরিমেয় শোষণ চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে এবং তাদেরকে উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশের প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সম্পদ নির্বিচারে লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে, ধনী ও গরীবের আয়ের তফাৎ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পুঁজির একত্রীকরণ ও কেন্দ্রীয়করণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই সময়েই পশ্চিম এশিয়া ও পরবর্তীতে আফগানিস্তানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। প্রায় সব সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এর অনুগত রাষ্ট্রসমূহ নয়া ফ্যাসিবাদীতে রূপান্তরিত হয়। শাসক শ্রেণিরা নয়া উদারবাদী নীতিমালাকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে তুলে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, এই নীতিমালা জিডিপি বৃদ্ধি করবে; অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, উন্নয়নকে তরান্বিত করবে আরো অনেক কিছু করবে। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে এইসব দাবী তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ল। সুতরাং, এইসব নয়া উদারবাদী নীতিমালার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ জনগণের জীবনের ওপর যে চরম সর্বনাশ ডেকে এনেছে সেদিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। কেবল অর্থনৈতিক মন্দাই নয়, বরং রাষ্ট্র দখলের যুদ্ধ, নয়া ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ, বলপ্রয়োগ ও অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের ওপর নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদিও নয়া উদারবাদী নীতিমালার সৃষ্টি।

সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র সমাধান হিসেবে সাম্রাজ্যবাদীরা ‘বিশ্বায়ন’কে গ্রহণ করেছে। পৃথিবীর মানুষের ওপর বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের জনগণের ওপর যুদ্ধ চাপানো, আরো শোষণ, নির্যাতন ও দমন পীড়ন। কাজেই, সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের অনুচর ভৃত্যদের বিরুদ্ধে লড়াই না চালালে জনগণ স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারবে না। সুতরাং, আমাদেরকে আমাদের বৃহৎ কৌশলকে সমৃদ্ধ করতে হবে ও এই পরিবর্তনসমূহকে মাথায় রেখে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৌশলে পরিবর্তন সাধন করতে হবে এবং জনগণকে বিপ্লবী যুদ্ধের জন্য সংগঠিত করতে হবে। স্লোগান, রাজনৈতিক কৌশল, সামরিক কৌশল ও কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনয়ন করতে হবে আর তাহলেই কেবল আমরা অগ্রসর হতে পারব। রাজনৈতিক লাইন ও দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথকে ত্যাগ করা কোন সমাধান নয় বরং এর প্রতি আরো দৃঢ়ভাবে অনুগত থাকাটাই সমাধান। আমরা যে কৌশলই গ্রহণ করি না কেন, তার লক্ষ্য হতে হবে রাজনৈতিক লাইন ও দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি পুনরায় বলছি যে, আমাদের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতার জন্য বর্তমান আধা ঔপনিবেশিক, আধা সামন্তবাদী ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে হলে যা প্রয়োজন তা হলো সঠিক মতাদর্শ, একটি সঠিক রাজনৈতিক লাইন, একটি সঠিক সামরিক লাইন, একটি শক্তিশালী ভ্যানগার্ড পার্টি, একটি শক্তিশালী জনগণের আর্মি এবং শক্তিশালী যুক্ত ফ্রন্ট। আর এটিই নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করার একমাত্র সমাধান।

 

পার্টি যাচাই করে দেখেছে যে বিশ্ব পরিস্থিতির অবজেকটিভ বাস্তবতা বিপ্লবের অনুকূলে যাচ্ছে, এক্ষেত্রে International Communist Movement (ICM) আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অবস্থান কী? আভাকিয়ানিজম ও প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোট কর্তৃক নেপাল বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার কী ধরনের প্রভাব ICM এর ওপর পড়তে পারে বলে আপনি মনে করেন?

বিপ্লবের অগ্রগতির পক্ষে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি চমৎকার। আগেই উল্লেখ করেছি, মহা মন্দার (Great Depression) পর সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা ভয়াবহতম সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। যার ফলে প্রচুর পরিমাণে কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে এসেছে। একদিকে আছে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য ও অন্যদিকে শ্রমজীবী শ্রেণির ওপর শোষণ ও নিপীড়িত জনগণের দেশসমূহে নয়া ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন। রাষ্ট্র দখলের যুদ্ধ স্তিমিত হবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; ইরাক, আফগানিস্তান ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আটকে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সাম্রাজ্যবাদ ও তার গৃহপালিত দোসরদের বিরোধী বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় স্বাধীনতাকামী বাহিনি শক্তিশালী হচ্ছে। শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত শ্রেণি, কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসী, মুসলিম ও অন্যান্য নির্যাতিত সম্প্রদায়, নারী, শিক্ষার্থী, তরুণ ও আরো অনেক নিপীড়িত শ্রেণি ও গোষ্ঠী পথে নেমে আসছে।

চাকরি থেকে ছাঁটাই, বেকারত্ব ও আংশিক বেকা্রত্ব,প্রকৃত মজুরী কর্তন,সামাজিক নিরাপত্তা খরচ প্রত্যাহার এবং সরকারের অন্যান্য কঠোর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নানা দেশে শ্রমিকদের বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশ ও ধর্মঘট সংঘটিত হয়েছে যা দেশগুলিকে নাড়া দিয়েছে। ধনী ও গরীবের ব্যবধান যত বাড়ছে ও শ্রেণিদ্বন্দ্ব যত তীব্রতর হচ্ছে, পুঁজিবাদী দেশগুলির জনগণ তত বেশি সংগ্রামে যোগদান করছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ জনগণ, মুসলিম, অভিবাসী ও অন্যান্য নিপীড়িত জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য বিক্ষোভ করছে। পশ্চাদপদ দেশগুলিতেও শ্রমজীবী জনগণের সম্পদের অসমতা,দারিদ্র্য, অভাব ও রাজনৈতিক নিপীড়ন গণ অভ্যুত্থানের জন্ম দিচ্ছে। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গণহত্যা ও রক্তের বন্যার মধ্য দিয়েও ইরাকি, আফগান,কুর্দি ও অন্যান্য জনগণের সশস্ত্র জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রগতি ঘটছে।

স্কটিশ, ক্যাটালনিয় ও ইউরোপের অন্যান্য জাতীর জাতীয় আকাঙ্ক্ষা অব্যাহত আছে। ব্রাজিলের মত গণ বিরোধী নয়া উদারবাদী নীতিমালা গ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের সরকারের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আমেরিকায় জনগণ বৃহদাকারে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।তবে বর্তমান বিশ্বের অনুকূল অবজেকটিভ পরিস্থিতি থেকে ICM এর সাবজেকটিভ শক্তিগুলি গুরুতরভাবে পিছিয়ে আছে। অবজেকটিভ পরিস্থিতির সম্ভাবনা ও বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অগ্রগতির জন্য একে সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাওবাদী বাহিনির সাবজেকটিভ ক্ষমতার মধ্যে একটি বৈপরীত্য রয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা থেকে আমরা জানি যে, প্রধানত প্রতিটি দেশের বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী বিপ্লব সংঘটনের মাধ্যমে এই সাবজেকটিভ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা যায়।

সংশোধনবাদী ও সংস্কারবাদীরা জনগণের সমস্যা সমাধানে অসমর্থ হওয়ায় মাওবাদী শক্তির সঙ্গে তাদের পুনরায় একত্রিত হবার সম্ভাবনা বাড়ছে। অনেক দেশে মাওবাদী পার্টি ও সংগঠন শক্তি অর্জন করছে এবং নতুন কিছু পার্টি গঠিত হবার প্রক্রিয়া চলছে। মাওবাদী পার্টি, সংগঠন ও বাহিনির ভেতরে ঐক্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেশ কিছু বিতর্কের মধ্য দিয়ে ফিলিপিন ও ভারতের দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ চলমান রয়েছে। অন্যান্য বেশ কিছু দেশেও মাওবাদী পার্টিরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের গণযুদ্ধের সমর্থনে আন্তর্জাতিক মাওবাদী শক্তিগুলির সংহতি কার্যক্রম, বিপ্লবী বিরোধী অপারেশন গ্রিন হান্ট ও ওপলান বায়ানিহানের (ফিলিপিনের বিপ্লবী বিরোধী অপারেশন)বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত, রাজবন্দীদের অধিকার নিশ্চিতকরণের সংগ্রাম ইত্যাদি চলমান রয়েছে। সুতরাং, ICM ও মাওবাদী শক্তিগুলির গণ সংগ্রামে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারাটা সম্ভব এবং এই পথ ধরে ভবিষ্যতে একটি বিপ্লবী জোয়ারের সূচনা ঘটবে।

প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোটের সংশোধনবাদ ও নেপালি জনগণের সঙ্গে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা অবশ্যই ICM কে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকেরা গৌরবময় গণযুদ্ধকে ভেতর থেকে ধ্বংস করেছে এবং নিপীড়িত নেপালি জনগণের ওপর কঠোর দমন পীড়ন অব্যাহত রাখতে শত্রুকে সাহায্য করেছে। শুধু নেপালি জনগণের জন্যই নয়, পুরো ICM এর জন্য এটি একটি উলট পালট ঘটিয়েছে। অবশ্য, প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোটের বিরুদ্ধে প্রকৃত মাওবাদী শক্তির তিক্ত লড়াই, সাম্রাজ্যবাদী ও তার দালালদের কাছে তাদের নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ এবং সর্বোপরি, এই বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে নেপালি জনগণের নিজেদের সংগ্রাম এই জোটের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রকে উন্মোচন করেছে এবং মার্কসবাদ- লেনিনবাদ- মাওবাদকে সমৃদ্ধ করার নামে এর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার চিত্রকে উন্মোচন করেছে।

সাম্রাজ্যবাদ, গৃহপালিত সামন্তবাদী ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী বেনিয়া ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সব থেকে বিশ্বাসী পা চাটা কুকুরে পরিণত হয়েছে এই আধুনিক সংশোধনবাদীরা। তাদের শ্রেণি সহযোগীদেরকে নেপালি জনসাধারণ ও ICM সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখান করেছে এবং এইসব বিশ্বাসঘাতকদেরকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে জনগণ নিশ্চিতভাবেই বিপ্লবের পথে অগ্রসর হবে। একইভাবে, আভাকিয়ানিজমের তথাকথিত নয়া সিনথেসিসও কিছু মাওবাদী পার্টিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ ছদ্মবেশি সংশোধনবাদ ও লিকুইডেশনিজম (liquidationism) ছাড়া আভাকিয়ানিজম আর কিছুই নয়। ICM এর ওপর ক্ষণস্থায়ীভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও এটি অবশ্যই পরাজিত হবে। আভাকিয়ানিজম ও সব ধরনের সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ও দেশের ভেতরে কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিশ্ব প্রলেতারিয়েতের অংশ হিসেবে  আমাদের পার্টি সংগ্রাম করে যাবে।

 

মোদী নেতৃত্বাধীন National Democratic Alliance সরকার দ্রুত গতিতে সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে এবং RSS (Rashtriya Swayamsevak Sangh) দ্রুত হিন্দুত্ববাদী প্রভাব ছড়িয়ে দিচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জোর দিয়ে বলেছে, ভারত রাষ্ট্র এখনো মাওবাদীদের সর্ববৃহৎ অভ্যন্তরীণ হুমকি বলে মনে করে। এর অর্থ সব ক্ষেত্রেই নিশ্চিতভাবে ফ্যাসিবাদী আক্রমণ বর্ধিত করে হয়েছে। পার্টি কীভাবে একে মোকাবেলা করার পরিকল্পনা করছে?

১৯৯০ থেকে ধারাবাহিকভাবে সব সরকার Liberalization Privatisation Globalisation নীতিমালা অনুসরণ করে এসেছে; আর ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসের মধ্যে NDA সরকার এই নীতিমালাকে তীব্রতর করেছে। মূলত পূর্ববর্তী ইউপিএ জোট সরকারের চাইতে আরো বেশি দ্রুত ও আগ্রাসীভাবে এই নীতিমালাকে চালিয়ে নেয়ার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে সাম্রাজ্যবাদী, বড় বড় পুঁজিবাদী দেশীয় দালাল ও ভূস্বামীরা মোদি ও বিজেপিকে রাষ্ট্রীয় কর্ণধার হিসেবে অধিষ্ঠিত করেছে। সুতরাং, একজন ‘দুর্বল’ মনমোহন সিং এর পরিবর্তে একজন ‘সরল’ নন্রেন্দ্র মোদীকে আনা হয়েছে। গুজরাটে সাম্রাজ্যবাদী নীতিমালা অনুযায়ী মেহনতি শ্রেণির ওপর নিষ্ঠুর শোষণ ও মুসলিম, দলিত ও আদিবাসীদের ওপর হিন্দু – ফ্যাসিবাদী নির্যাতন চালানো হয়েছিল মোদির অধীনে। এই ‘গুজরাট মডেল’ এখন গোটা ভারতে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।    

মোদি সরকারের আগ্রাসী নয়া উদারবাদী নীতিমালা শ্রমিক, কৃষক, সরকারী কর্মচারী ও নারী, শিক্ষার্থী ও তরুণ সহ অন্যান্যদের দুর্ভোগকে তীব্রতর করে তুলেছে। মুসলমানদের ওপর রাষ্ট্র ও হিন্দু ফ্যাসিবাদীদের হামলা বাড়তে থাকবে। সামন্তবাদী প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনি শক্তিশালী হবার ফলে দলিতদের ওপর নিষ্ঠুরতা বাড়ছে। নির্যাতিত জাতি গোষ্ঠী আরো বেশি উৎপীড়নের শিকার হচ্ছে। NDA এর আগ্রাসী সম্প্রসারণবাদী নীতিমালার সমর্থনে উগ্র জাতীয়তাবাদী বড় বড় জাতির প্রচারণা দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মাঝে প্রতিবাদের জন্ম দেবে। এই ধরনের ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করে জনগণকে সংগ্রামে সংগঠিত করা প্রয়োজন। Liberalization Privatisation-Globalisation কার্যসূচির আগ্রাসী বাস্তবায়নের ফলস্বরূপ নয়া ঔপনিবেশিক মরণথাবা গোটা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।

জনসাধারণের ক্ষোভকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে উগ্র দেশপ্রেম ও ভুয়া জাতীয়তাবাদের কথা প্রচার করবে সঙ্ঘ পরিবার। মোদি সরকার কর্তৃক দেশকে পাইকারি দরে বিক্রি করে দেয়ার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে এই ধরনের ছলচাতুরিকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। মোদির কার্যসূচির সাম্রাজ্যবাদপন্থী, সামন্তবাদপন্থী বৈশিষ্ট্যকে উন্মোচন করে আমাদেরকে বৃহৎ পরিসরে প্রচারণা চালাতে হবে। মোদির ‘উন্নয়ন’ কর্মসূচির আগ্রাসী প্রচারণার ফলে অস্বাভাবিক হারে উচ্ছেদের ঘটনা ঘটবে। আদিবাসীদের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে যা গণ সংগ্রামকে অগ্রসর করবে। যথোপযোগী পন্থা অবলবন করে এই সংগ্রামে আমাদেরকে সরাসরি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে কিংবা সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে। জনগণের ওপর এই হামলার সঙ্গি হবে বিভিন্ন কালো আইন। জনগণের জল – জঙ্গল – জমি ও জীবিকা ছিনিয়ে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী, বড় বড় ভূস্বামী ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী দেশীয় দালালদের উপযোগী করে পুরনো আইনকে সংশোধন করা হচ্ছে ও নতুন আইন প্রবর্তন করা হচ্ছে।           

প্রকাশ্যে আইন লঙ্ঘন ও রাজবন্দীদের ওপর নৃশংস অত্যাচার এবং যারা এ ধরণের বিষয় নিয়ে কাজ করছে তাদের ওপর দমন পীড়ণ চালানো হচ্ছে। আমাদেরকে অবশ্যই এই ধরনের বিষয়গুলিতে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে। বৃহৎ পরিসরে বেসামরিক নাগরিক অধিকার আন্দোলন গড়ে তোলা ও জোরদার করার ক্ষেত্রে বেশ ভাল সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি যাচাই করে আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটি লক্ষ্য করেছে যে কেন্দ্রে Rashtriya Swayamsevak Sangh (RSS) আধিপত্যবাদী এনডিএ সরকার গঠনের ফলে দেশ জুড়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে লড়াই করাটা জরুরী কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপবী, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ওদেশপ্রেমিক সংগঠন, বাহিনি, ব্যক্তই ও বৃহৎ জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করে ব্যাপক ভিত্তিক শক্তিশালী গণ আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে এটি সম্পাদন করা সম্ভব। মোদির কার্যসূচির সাম্রাজ্যবাদপন্থী, সামন্তবাদপন্থী চরিত্রকে উন্মোচন করতে ব্যাপক পরিসরে বাস্তব প্রচারণা চালাতে হবে। অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপকে মোকাবেলা করার জন্য চলমান কর্মকাণ্ডে তাদেরকে যুক্ত করার লক্ষ্যে অবশ্যই এই সমস্ত কার্যক্রম চালাতে হবে।

United Progressive Alliance সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিকে তোতা পাখির মত অনুকরণ করে ফ্যাসিবাদী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ঘোষণা করেছেন মাওবাদীরা ‘এখনো বৃহৎ অভ্যন্তরীণ হুমকি’ এবং মাওবাদী আন্দোলনে পাল্টা আক্রমণ করাকে তার সরকার অগ্রাধিকার প্রদান করেছে। পার্টির বলশেভিকীকরণ, গণযুদ্ধকে তীব্রতর করা ও বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে আমরা বিপ্লব বিরোধী এই নতুন আক্রমণকে প্রতিহত করব।  

 

অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। পার্টি কীভাবে একে মোকাবেলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে?

২০০৯ সালের মাঝামাঝিতে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ-২ সরকার যে পদক্ষেপটি নেয় তা হলো অপারেশন গ্রিন হান্ট- জনগণের ওপর যুদ্ধ চালু করা। এটি ছিল আমাদের দেশের সংগ্রামী জনগণের ওপর দেশব্যাপী বহুমুখী বিপ্লব বিরোধী যুদ্ধ। অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপ চালু করে মোদির নেতৃত্বে NDA সরকার আরো আগ্রাসী ও আরো নিষ্ঠুরতার সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারগুলির মতো একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করে চলেছে যা পূর্বের দুটি ধাপ অপেক্ষা আরো ব্যাপক ও আরো তীব্র।

যে সব এলাকায় আমাদের আন্দোলনের শক্ত ভিত্তি রয়েছে সেখানে এইসব গণ বিরোধী নীতিমালা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উদ্ভূত হয়েছে আমাদের পার্টির নেতৃত্বে সাধারণ জনগণ। বিরোধী দলে থাকাকালীন মাওবাদী আন্দোলনকে দমনের জন্য কোন সুসংহত ও কেন্দ্রীভূত নীতিমালা প্রণয়ন না করায় ইউপিএ সরকারের সমালোচনা করেছিল বিজেপি। ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি নেতৃত্বাধীন NDA সামগ্রিক নিম্ন আয়ের দেশের Lower Income Country পরিকাঠামোর অধীনে অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপ রূপে এখন এই ধরণের একটি সমন্বিত নীতি বাস্তবায়ন করছে। নেতৃত্ব পর্যায়ের সকলের মাথার চড়া দাম ঘোষণা, নতুন আত্মসমর্পণ নীতিমালা প্রচার, জনগণের কাছে শাস্তি পাওয়া বিপ্লব বিরোধীদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বৃদ্ধি, ভুয়া সংস্কার, নাগরিক কার্যকলাপ ইত্যাদি কার্যক্রম তীব্রতর করা হচ্ছে। তৃতীয় ধাপে নতুন যে বিষয়গুলি উপস্থাপন করা হয়েছে সেগুলি হলো- যুদ্ধে অপারেশন পরিচালনার জন্য বাহিনিকে পরিবহনের ক্ষেত্রে বিমান বাহিনির ব্যবহার এবং অত্যাধুনিক ড্রোন/ইউএভি (Unmanned Aerial Vehicle-UAV) প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্কিন ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা।

রাজ্য ও কেন্দ্রে কমাণ্ডো বাহিনির নতুন নতুন ইউনিট গড়ে তোলা ও বর্তমানে যে বাহিনি রয়েছে তার সংখ্যা বৃদ্ধি করা, যুদ্ধ করার সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য সশস্ত্র বাহিনির আধুনিকীকরণ, আমাদের আন্দোলন চলমানরত স্থান সমূহে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের উন্নয়ন ঘটানো, ভুয়া বন্দুকযুদ্ধ, মারপিট, জনগণের সম্পদ, লুণ্ঠন, গ্রেফতার, হেফাজতে নর্যাতন, ধর্ষণ ও আরো বিভিন্ন নিষ্ঠুর উপায়ে নিপীড়ন চালানো সহ জনগণের ওপর অত্যাচার তীব্রতর করার মধ্য দিয়ে দরকারের নীতিমালাকে পরিপূর্ণতা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু মনস্তাত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে গণমাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। আমাদের জবাব হতে হবে অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপের বিশেষত্ব বুঝে।

দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের অগ্রগতিতে মধ্য ও পূর্ব ভারতের আদিবাসী জনগণ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। তারা বৃহৎ সংখ্যায় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে, নিজেদের রক্ত ও ঘাম দিয়ে একে রক্ষা করেছে এবং এর অগ্রগতির জন্য ভিত্তি প্রস্তুত করেছে। এ কারণে, মধ্য ও পূর্ব ভারতের অংশ বিশেষ বিপ্লবের শক্ত ঘাঁটি হসেবে উদ্ভূত হয়েছে। অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপের মধ্য দিয়ে এই মজবুত ঘাঁটিগুলি ধ্বংস করার প্রতি মনোনিবেশ করছে শত্রু। আক্রমণজের ভেতর পরিমাণগত ও গণগত পরিবর্তন আনয়নের মাধ্যমে পার্টিকে, বাহিনিকে ও নিয়া গণতান্ত্রিক শক্তির আবির্ভাবমান সংগঠনগুলিকে শত্রু ধ্বংস করতে চাইছে; যাতে করে এর জায়গায় পুরনো রাষ্ট্র ও ক্ষয়ে যাওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পুনর্বহাল করা যায়। মাওবাদী আন্দোলনকে লক্ষ্য করে এই নতুন ও পুরনো শরনের নিপীড়ন চালানো হলেও এর লক্ষ্যবস্ত্য কেবল মাওবাদীরাই নয়। জনগণের ওপর চালিত এই যুদ্ধ নিশ্চিতভাবে সকল নির্যাতিত মানুষের দিকে প্রসারিত হবে। শ্রমিক, কৃষক, দলিত, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নির্যাতিত জাতিগোষ্ঠী, নারী ইত্যাদি সকল শোষিত শ্রেণি ও সামাজিক গোষ্ঠী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, বিচারগত ও সামরিক দিক থেকে আক্রমণের সম্মুখীন হবে। সুতরাং, যুদ্ধের ক্ষেত্র বিস্তৃত হবে। মোদি সরকারের দেশ বিক্রয় নীতিমালা ও ভ্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের সম্মিলনে আগত শত্রুর আক্রমণের নতুন ধাপকে আমাদের রাজনোইতিক ও সামরিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে।

মোদি, রাজনাথ সিং, জৈতলে, ভেনকাইয়াহ নাইডু, গাদকারি কিংবা NDA সরকারের যে কেুই হোক না কেন; জনগণকে বোকা বানানোর জন্য এরা বলছে এক আর করছে ঠিক এর বিপরীত। জনগণের বিরুদ্ধে আক্রমণের চরমপন্থা হিসেবে শাসক শ্রেণি সংবিধান বহিরভূত ও বিচার বহির্ভূত পথ ব্যবহার করছে; আর এর ফলে ফ্যাসিবাদী মোদি সরকারের গণ বিরোধী চেহারা আরো বেশি করে উন্মোচিত হচ্ছে। যে সকল জনগোষ্ঠীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে এই আক্রমণের মোকাবেলা করতে হবে ও একে পরাজিত করতে হবে। এর জন্য আমাদের নীতিমালা ও কৌশল এমন হতে হবে যেন সকল গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও দেশপ্রেমিক শক্তি জনগণের পক্ষে একত্রে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে মোদির প্রতিক্রিয়াশীল নীতিমালার বিরোধিতা করে ও অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপের বিরুদ্ধে পাল্টা লড়াই চালায়। সংসদীয় ‘বাম’রাও নিজেদের মতো করে শত্রুর আক্রমণের বিরোধিতা করবে। এই লড়াইয়ে যোগ দিতে তাদের এগিয়ে আসা উচিত। শত্রুর এই বহুমুখী আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সকল ক্ষেত্রের সকল শক্তিকে আমরা আহ্বান জানাই। শত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোন, ঐক্যবদ্ধ হোন এবং ঐক্যবদ্ধ হোন! সার্বজনীন শত্রুর বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানুন, পাল্টা আঘাত হানুন! 

 

-----------------------

সূত্র : http://maoistroad.blogspot.com/2015/06/maoist-information-bulletin-mib.html