মৃত্তিকা চাকমা

কাপ্তাই বাঁধের কারণে আমাদের পুরো গ্রামটাই পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিলো মৃত্তিকা চাকমা

 

[জুম ইসথেটিকস্ কাউন্সিল (জাক) এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি, সাহিত্যিক ও নাট্যকার মৃত্তিকা চাকমার সাক্ষাৎকার নিই ১৯ আগস্ট ২০১৬,  শুক্রবার সকাল ১১.০০ টার দিকে। মূলত চাকমা ভাষায় সাক্ষাৎকারটি নিয়ে পরে তা বাংলায় শ্রুতিলিখন করি। সাক্ষাৎকারটিতে তাঁর শিল্প কর্ম/সৃষ্টির উপর নয় বরং তাঁর বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া কিংবা সময়কে জানতে চেয়েছি। তিনিতো সরকারি চাকুরে হতে পারতেন, ব্যাংকার হতে পারতেন, গেরিলা হতে পারতেন, জুমচাষী বা কৃষকও হতে পারতেন। কিন্তু কেন ও কিভাবে তিনি ‘মৃত্তিকা’ হয়ে উঠলেন, হয়ে উঠলেন সাংস্কৃতিক আন্দোলন কর্মী, নাট্যকার ও কবি? সাক্ষাৎকার নেয়া এবং তার লিখিতরূপ সম্পাদনে অশেষ সহযোগিতার জন্য অর্ণব দেওয়ান এবং মন্টি দেওয়ানের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। —চয়ন চাকমা।]

 

আপনার ছোটবেলার কথা শুনতে চাই। কাপ্তাই বাঁধের ফলে আপনাদের উদ্বাস্তু হওয়ার পর নতুন গ্রামে বসতি...

আমার জন্ম বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের কাবত্যাদোরের মুগছড়ি নামক গ্রামে। সেখান থেকে কাপ্তাই বাঁধ হওয়ার ফলে যারা উদ্বাস্তু হয়ে যায় তাদের সাথে আমাদের পরিবারও উদ্বাস্তু হয়।

তখন আপনার বয়স কত ছিল?

তখন আমার ৩-৪ বছর বয়স। অল্প মনে করতে পারি, আমরা নৌকায় করে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি জানি না। আমার তখনও জানার বয়স হয়নি। আমাদের ঘরবাড়ি ডুবে যাচ্ছিল। ঘরের ইজর (এক ধরনের মাচাং যা আদিবাসীদের ঘরের বাইরে কিন্তু লাগোয়া অবস্থায় থাকে) থেকে হাত দিয়ে পানি ধরা যেত। আমরা সম্ভবত দুইটা নৌকায় করে আমাদের সংসারের যতটুকু সম্ভব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নতুন ঠিকানায় চলে যায়।

আপনাদের গ্রামের সবাইকেই কি কাপ্তাই বাঁধের কারণে উদ্বাস্তু হতে হয়?

হ্যাঁ, কাপ্তাই বাঁধের কারণে আমাদের পুরো গ্রামটাই পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিলো। যাদের অন্যান্য জায়গায় আত্মীয়-স্বজন ছিলো এবং সরকার যাদের জমি বন্দোবস্ত দিয়েছিলো তারা সেসব জায়গায় চলে যায়। আমরাও সেভাবে চলে যায়। আমাদের পরিবার খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার লোগাং গ্রামে বসতি করে।

লোগাং -এ কি আপনাদের আত্মীয় ছিলো?

হ্যাঁ। আমাদের আত্মীয় ছিলো। তাদের মাধ্যমেই সেখানে যাওয়া হয়। সেখানেই বসতি। তার পরবর্তী আমি সেখানে লোগাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ওখানেই আমার আনুষ্ঠানিক পড়াশুনা শুরু। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত আমি সেখানেই পড়াশোনা করি। ১৯৭৪ সাল নাগাদ আমি রাঙ্গামাটিতে চলে আসি। সেখানে বনরূপার কাঠালতলী হাই স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হই। বর্তমানে এই বিদ্যালয়টি রানীদয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয় নামকরণ করে রাজবাড়ীতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

পুরোনো রাংগামাটি শহরটা কেমন ছিলো?

রাংগামাটি শহর সম্পর্কে আমার খুব একটা ধারনা নেই। ঝাপসাভাবে মনে ভাসে- পানি বেড়ে গেছে, মানুষজন নৌকা করে তাদের সহায় সম্বল নিয়ে যে যেদিকে পারছে সেদিকে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে জানি না। বয়স হওয়ার পর জানতে পারি কাপ্তাই বাঁধের কারণে আমরা উদ্বাস্তু হয়ে লোগাং নামে নতুন গ্রামে বসতি স্থাপন করি। ১৯৭৪ সাল থেকেই রাংগামাটিতে আছি। আমার কলেজ জীবনও এখানে কাটে। কলেজ জীবন শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা শেষ করে মোনঘর স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়েই তো আপনারা ‘জাক’ গঠন করেন? প্রথমেতো এটি রাংগামাটি ইসথেটিকস কাউন্সিল (রাক) নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এটি জাক নামে নামকরণ করা হয়। কিসের পরিপ্রেক্ষিতে তখন আপনারা এই সাংস্কৃতিক সংগঠনটি গঠনে উদ্যোগী হন?

আমরা যখন কলেজে পড়তাম তখন থেকেই লেখালেখি করতাম। ‘বনভূমি’ নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় তখন আমরা মাঝেমধ্যে লিখতাম। এ. কে. মকসুদ আহমেদ ছিলেন উক্ত পত্রিকার সম্পাদক। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয় নিয়ে ভর্তি হলাম। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বিভিন্ন আলোচনায় একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বার বার উঠে আসে যার মাধ্যমে আমরা সাহিত্য বিষয়ে পড়বো, সাহিত্য ও সাংস্কৃতি নিয়ে কাজ করবো। কবিতা, নাটক, গান লিখবো। এই প্রয়োজনীয়তা অনুভব থেকেই আমরা একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করি যার নাম রাংগামাটি ইসথেটিকস কাউন্সিল (রাক)। ১৯৮১ সালে এ আমরা এ সংগঠনের আত্মপ্রকাশ করি। এর আগেই এটির জন্ম হয়েছে কিন্তু সাংগঠনিকভাবে হয়েছে ১৯৮১ সালে । যা পরে জাক নামে নামকরণ করা হয়।

আপনারা সবাই কি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ছিলেন?

না, সবাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিলাম না। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েরও ছিলো। মূলতঃ এই তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই ছিলাম। তো ১৯৮১ সালে আমরা এ রাংগামাটি ইসথেটিকস কাউন্সিল (রাক) গঠন করি। রাক গঠনের প্রথম দিকে আমাদের প্রকাশনাগুলো মূলত বিজুকেন্দ্রীক ছিলো। মাঝে মাঝে অন্যান্য সময়েও লিটল ম্যাগাজিন বের হত যদিও এর পরিমাণ কম ছিলো। ১৯৮৩ সালে থেকে আমরা প্রথম চাকমা নাটক মঞ্চস্থ করা শুরু করি। রাংগামাটিতে দর্শক ছিলো না, লোকজন আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করতো। আমাদের চাকমা শিক্ষিত সমাজ শুধু বাংলা সাহিত্য, বাংলা নাটক নিয়ে পড়ে থাকতো আর অন্যদিকে নিজের সাহিত্য, সংস্কৃতি বিষয়ে উদাসীন ছিলো। একটি জাতির যে নিজস্ব সাহিত্য সংস্কৃতি রয়েছে সে বোধটুকুও তাদের ছিলো না। তাই আমরা যখন নাটক মঞ্চস্থ করা শুরু করলাম আমাদের নিয়ে অনেক হাসাহাসি হলো, পাগল বলা হলো। আমরা ছিলাম ঠিকানাবিহীন মানুষ। রাত্রি যাপনের নির্দিষ্ট কোন জায়গা ছিলো না। কখনো এর বাসায়, কখনো ওর বাসায় আমদের রাত কাটতো। রাংগামাটিতে আসলে বন্ধু-বান্ধবের বাসায় কোনমতে থাকতাম। আমরা সবাই ছিলাম গ্রামের ছেলে। আমাদেরকে বলা হলো “এই যে এরা গ্রাম থেকে এসে এভাবে গান বাজনা, নাটক করে বাবা মার টাকা নষ্ট করছে,আনন্দ ফুর্তি করছে।” নাটকের টিকিট বিক্রি করতে যেতাম। এক প্রকার জোর জবরদস্তি করে বিক্রি করতে হতো। একটা টিকিটের দাম ছিলো দশ টাকা।

আপনার একটা বিখ্যাত নাটক ‘বান’। এটি কি ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৮৩ সালের ঘটনা নিয়ে?

না, ১৯৬১ থেকে ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি পর্যন্ত আমাদের এখানকার পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস আমি এই নাটকে তুলে ধরতে চেয়েছি। কাপ্তাই বাঁধের ফলে এখানকার জনগোষ্ঠীর উপর কি প্রভাব তা বেশি প্রতিফলিত হয়েছে। একটু আগে যেমনটি বললাম- আমার ছোটবেলার নৌকায় করে মানুষজনের বিভিন্ন দিকে চলে যাওয়া এসব দৃশ্যাবলী এখনও আমার চোখে ভাসে।

আপনি তো গানও লেখেন। গান শোনার সময় পান? কোন সময়টাতে গান শুনতে পছন্দ করেন?

গানতো খুবই কম লিখি। মানুষজনের পীড়াপিড়ীতে লিখতে হয়। গান লিখে দিতে বলে, সুর ওরা করে নেবে। এভাবে হয়তো লেখা হয়। গানের স্বরলিপিতো আমি বুঝি না। আমি কবিতা লিখি। তারা সেটাকে সুর দিয়ে গান বানিয়ে নেয়। এখন লিখতে লিখতে গানের সুর-স্বরলিপি কিছুটা ধরতে পারি। এটা আমার প্রাধান্যের বিষয় নয়। প্রয়োজনে হয়তোবা দু-একটা লিখি।

আপনিতো ছবিও আঁকেন...

মূলত লেখালিখি করতে করতে ছবি আঁকা। ছবি আঁকাও ঠিক না, কলম নিয়ে আঁকিবুকি করা।

রবীন্দ্রনাথ থেকে অনুপ্রেরণা?

অনেকটা সেরকম। রবীন্দ্রনাথ তো রং তুলি, পেন্সিল, জলরং ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমে করেছেন। আমিতো তাঁর মতো প্রতিভাবান নই। শুধু পান্ডুলিপির উপর কাটাকাটি করতে গিয়ে ছবির মতো হয়ে যায়। পরে ভেবে দেখলাম পান্ডুলিপির উপর কাটাকাটি না করে সাদা কাগজে তো চেষ্টা করতে পারি। সাদা কাগজে আঁকলাম, মন্দতো না-এভাবেই ছবি আঁকা। যে ছবিগুলো আমি এঁকেছি সবগুলোই আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও জুম্মদের উপরে। এখন আর আঁকি না। সময় হয়ে ওঠে না। বিভিন্ন জায়গায় লেখা দিতে হয়, এছাড়া স্কুলের কাজ সব মিলিয়ে আর সময় হয় না। এখন সব বাদ দিয়ে স্কুলটার কাজে মনযোগ দিয়েছি।

আপনারা যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করলেন তখনতো বিভিন্ন পেশায় যাওয়ার সুযোগ ছিলো। কিন্তু আপনি/আপনারা মোনঘর স্কুলে শিক্ষকতা কি কারণে পেশা হিসেবে বেছে নিলেন? এর পেছনে কোন উদ্দেশ্য ছিলো কি?

আমাদের একটা লক্ষ্য ছিলো। আমরা যদি সরকারি বা অন্যান্য চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করি তখন এই জুম্ম জাতি বা চাকমা জাতিকে কিছু দিতে পারবো কিনা সন্দেহ ছিল। নিজে হয়তো অনেক কিছু পেতাম কিন্তু হয়তোবা আমার জাতিকে কোনকিছু দেওয়া হতো না। যদি এই জাতির জন্য কিছু করতে চাই তাহলে সেটা কিভাবে? একটা প্রতিষ্ঠান মোনঘর, যেখানে তিন জেলা সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধি ছেলে মেয়ে পাওয়া যাবে। তাদের নিয়ে যদি কাজ করি তবে জাতিকে কিছু দেয়ার আকাংখা পূর্ণ হয়। আমরা এখানকার প্রায় সব শিক্ষকই বিভিন্ন চাকরি পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা যায়নি।

সে সময় চাকরি পাওয়া কি সহজ ছিলো?

না, সহজ ছিলো না। এরশাদ সরকারের ৯ বছর শাসনামলে সকল ধরনের নিয়োগ বন্ধ ছিলো। একমাত্র ছিলো ঢালাওভাবে বেকারদের তালিকা করে তাদের চাকরি দেওয়া হতো। আমাকেও Food Inspector হিসেবে বান্দরবান পোস্টিং দেওয়া হয়েছিলো। যোগদানপত্রও হাতে দিয়েছিল। ওখানেই রেখে চলে এসেছি। আমি নিইনি।

জাকের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য আপনারা কতজন ছিলেন? সবাই কি বন্ধু ছিলেন?

সাংগঠনিক পর্যায়ে ৮-১০ ছিলাম। ১৯৮১ সালে আত্মপ্রকাশের পর সদস্য সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। ইয়াং বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ পড়ুয়ারা অনেকেই আমাদের সাথে যুক্ত হয়। তারা আমাদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী হয়। জাকের এখন অনেক সদস্য।

আপনাদের প্রধান উদ্দেশ্যতো ছিলো জুম্মদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সম্পর্কে চেতনা জাগরণ করা।

হ্যাঁ, আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো এটাই। এ কারণে আমরা সকলেই মোনঘর-এ শিক্ষকতা শুরু করি এবং সেখান থেকে আর অন্য কোন পেশায় গিয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করিনি।

এ সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আপনারা কোন্ মাধ্যমে mass people এর কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন বলে মনে হয়? গল্প, কবিতা, নাটক?

মাধ্যম বলতে আমি বলবো কবিতা। কবিতা লিখে ছোট কাগজের মাধ্যমে সাধারন মানুষের কাছে যাওয়া সহজ হয়েছে। পকেটে ছোট একটা কবিতার কাগজ নিয়ে আমরা গ্রামে গ্রামে পৌঁছে গেছি।

আপনাদের নাটক-

নাটকতো তখন শুধুমাত্র রাঙ্গামাটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। শহরে যাদের বসতি ছিলো, জানাশোনা ছিলো তারাই আসতো নাটক দেখতে। এটা একটা সরাসরি মাধ্যম। পরে যখন নাটকের উপর বৃহৎভাবে মনযোগী হলাম, নাটককে আমরা ভিডিওতেও রূপান্তরিত করলাম। এই নাটকের ভিডিও ক্যাসেটগুলো আমাদের কাছ থেকে নিয়ে গ্রামে গ্রামে দেখানো হতো। এভাবে একটা জাগরণ তৈরি হয়। এরপর আমরা আমাদের নাটক আউটডোর শুটিং এর মাধ্যমে বর্তমানে টেলিফিল্ম এর মত করে তৈরি করি।

জাকের প্রথম মঞ্চস্থ নাটক তো ‘আনাত ভাজি উধে হা মু’ (আয়নায় ভেসে ওঠে কার মুখ)?

হ্যাঁ, চিরজ্যোতি চাকমা-র লেখা নাটক ছিলো এটি। মঞ্চস্থ হয় রাংগামাটির টাউন হলে।

আপনিতো চাকমা সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় এবং বিখ্যাত নাট্যকার? আপনার নাটকগুলোর মধ্যে কোনটি আপনার সবচেয়ে প্রিয়?

সবচেয়ে প্রিয় নাটক ‘বান’।

এই নাটকে তো আপনি আপনার জীবনের কথা বলতে পেরেছেন।

এটা একদম আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। আমি যা দেখেছি, শুনেছি, যা ঘটেছে, আমার মনে দাগ কেটেছে তা এখানে পরিস্ফুত করতে পেরেছি।

এই বাঁধের কারণে আমাদের জীবন ধারায়ও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যৌথ পরিবারে সবাই একসাথে থাকা বা আত্মীয় স্বজনরা মিলেমিশে একই গ্রামে থাকার জীবন এই বাঁধের মাধ্যমে পরবর্তন হয়। অনেক কাছের কেউ অনেক দূরের গ্রামে চলে যায়-

প্রথম যখন ‘বান’ নাটকটি এই রাংগামাটির কালচারাল ইনিস্টিটিউট-এ মঞ্চায়ন করি, কিছু বয়স্ক লোক নস্টালজিয়ায় চলে যায় । তাদেরকে চোখের পানি ফেলতেও দেখা গিয়েছিলো। আমার আরও একটি নিজের ব্যক্তিগত প্রিয় নাটক -দেবংসি আহধর হালা ছাবা। এটা আমার প্রথম নাটক।

এটাতো বহুবার মঞ্চায়িত নাটক?

হ্যাঁ, এটা অনেকবার মঞ্চায়িত হয়েছে। অন্যরাও এটি নির্দেশনা দিয়েছেন, মঞ্চায়িত করেছেন। দেবংসি আহধর হালা ছাবা নাটকের পেক্ষিত আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের সুখ, দুঃখ হাসি কান্না নিয়ে।

মিথেরও ব্যবহার হয়েছে আপনার উক্ত নাটকে?

হ্যাঁ, মিথও আছে। মোটামুটি মানব জীবনে সচরাচর যা ঘটে-প্রেম-প্রীতি, দুঃখ-দুর্দশা এগুলোই এখানে আছে। আমি তখন সবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করেছি। আমার রিলেটেড সাবজেক্টও ছিলো নাটক। আমিতো বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম। বাংলা সাহিত্যের সাথে রিলেটেড সাবজেক্ট হিসেবে নাটক ছিলো। আমার নাট্যগুরু ছিলেন জিয়া হায়দার। আমার শিক্ষক। তিনি এখন আর বেঁচে নেই। মূলতঃ তিনিই আমার নাটকের আদর্শ গুরু।

আপনার সাহিত্যের প্রতি ঝোঁকটা তৈরি হয়েছিলো কখন?

ছোটকাল থেকেই এটা আমার মধ্যে ছিলো। উদ্বাস্তু হয়ে আমরা যখন লোগাং গ্রামে বসতি গড়ি তখন ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক মাস কৃষিকাজ শেষ করার পর একটু অবসর পেতাম। ফলে তখন গেংগুলি গান, কবিগান শুনতাম। আর উবোগীতও হতো। আমি এসব রাখাল বালক, ধানী জমিতে কাজের লোককে গাইতে শুনেছি । জুমে বসেও লোকজনকে এসব গাইতে শুনেছি। এসব দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে আমি বড় হয়েছি। বিভিন্ন ধাঁধাও দেওয়া হতো। এসব দেখে আমি চিন্তা করলাম এগুলোতো খুব ভালো চর্চা। এগুলোইতো একটা জাতির পরিচিতি। এগুলোই সাহিত্য, সংস্কৃতির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, শিরা-উপশিরা। বাংলা সাহিত্যের মধ্যে যেমন কবি গান, ভাওয়াইয়া, ভাটয়ালি, জারি-সারি আছে, অনুরূপভাবে আমাদেরও আছে। তাহলে আমাদেরটাই কেন অবহেলায় পড়ে থাকবে? আমরা যারা এমন চিন্তা করতাম, সমচিন্তার মানুষরা মিলেই এই সাংস্কৃতিক সংগঠনটি গঠনে উদ্যোগী হলাম। বলতে গেলে ’জাকে’র সদস্যরা সবাই গ্রামের ছেলে। এভাবেই আমরা আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে আছি।

জুম্ম সাহিত্য বিকাশের সংগ্রামে একসাথে পথ চলা অনেক সহযোদ্ধা মাঝপথে হারিয়ে গেছেন, এনাদের মধ্যে অসম্ভব প্রতিভাবান ছিলেন-

হ্যাঁ, আমাদের অগ্রজ সুহৃদ বাবু ছিলেন, সুসময় ছিলেন। রাক গঠনের পেছনে সুহৃদ বাবুর অবদান ছিলো অনেক বেশি। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য আমরা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। আমাদের দূর্ভাগ্য, জাতির দূর্ভাগ্য। তিনি বেঁচে থাকলে সাহিত্য অঙ্গনে আমরা আরও রিচ হতে পারতাম। আমরা জীবনের ঘানি টানতে টানতে দাঁড় ভাঙা কাঁকড়ার মতো যতটুকু সাধ্যে কুলায় তা চাকমা সাহিত্য সংস্কৃতিকে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ভবিষ্যত প্রজন্ম কিভাবে মূল্যায়ন করবে তা জানি না।

কোন ভাষার লিখিত চর্চা না থাকলে ঐ ভাষার বিকাশ সম্ভব হয় না এবং আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়। আমাদের নিজস্ব ভাষার যে বর্ণমালা রয়েছে-

আমরা এ বিষয়ে আগেই কাজ শুরু করেছি। বিভিন্ন লেখায় চাকমা বর্ণমালা বিষয়ে আলোচনা করেছি, ব্যবহার বিধি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এমনকি লেখায় বাংলা বর্ণের পাশাপাশি চাকমা বর্ণও ব্যবহার করেছি। বাংলা বর্ণমালায় লেখার পাশাপাশি চাকমা বর্ণমালায় লেখার চর্চা আমরা প্রথম শুরু করি। আগপুদি নামে বাল্যশিক্ষার একটা বই করি। আমাদের লক্ষ্য পরবর্তীতে যখন আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, গ্রামার শক্তিশালী হবে তখন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এ কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে। নিজের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সৌন্দর্য্যরে জন্য যা সম্ভব তা করবে। আমরা শুধু একটা প্রাথমিক চিত্র দিয়ে গেলাম। এরপর আমরা আর একটা ‘দিগপাতা’ নামে ১৬-১৭ পৃষ্টার লিটল ম্যাগাজিন বের করি। যেখানে প্রত্যেক সংখ্যায় এক-একটি বর্ণের ব্যবহার, পরিচিতি -এসব দেয়া হতো। চাকমা ভাষায় বিভিন্ন লেখা দেয়া হতো।

আপনারা তো মোস্তফা জাব্বারের সহায়তায় চাকমা বর্ণমালার কম্পিউটারাইজড ফন্ট তৈরি করেছেন?

হ্যাঁ, এ ধরনের কাজ মনে হয় সর্বপ্রথম করেছেন নবারুন চাকমা। তবে তাঁর কাজটা কতদূর এগিয়েছে জানিনা। দেখার সুযোগও হয়নি। শান্তিচুক্তির পরে মোস্তফা জাব্বারের সাথে আমাদের যোগাযোগ হয়। আমর উনাকে প্রস্তাব দিলাম- যেহেতু বাংলা বর্ণমালার জন্য উনি বিজয় তৈরি করেছেন সেহেতু চাকমা বর্ণমালার জন্য ফন্ট তৈরি করার কাজটি উনি করতে পারবেন কিনা। উনি আমাদের প্রস্তাবটি সাদরে গ্রহণ করেন। ঢাকাতে উনার বাসায় ঝিমিত চাকমা আর আমি দুজনে মিলে আমাদের বর্ণমালা সম্পর্কে ধারনা দিতাম আর সেভাবে উনি ডিজাইনগুলো করতেন। কাজ শেষ হওয়ার পর আমরা রাংগামাটিতে এর প্রকাশনা উৎসব করি। মোস্তফা জাব্বার এর নাম দিলেন বিজয় চাকমা। এ ফন্টে অক্ষরগুলো খুব একটা সুন্দর না হলেও কোনমতে লেখা যায়। আরও কিছু কাজ বাকী আছে। কিন্তু নানা কারনে সময় হয়ে উঠে না। তিনিও ব্যস্ত মানুষ আর আমরাও নানা কাজে ব্যস্ত থাকি। আমাদের ছেলেমেয়েরা এ বিষয়ে শিক্ষিত হচ্ছে। আশা করি তারা কাজটা এগিয়ে নিতে পারবে।

আমাদের ভাষায় এখনো সেরকম বিকাশ ঘটানো যাচ্ছে না। চাকমা বর্ণমালা ব্যবহার করেও সাহিত্য চর্চা হচ্ছে না। এর কি কারন বলে আপনি মনে করেন?

ছোটবেলা থেকেইতো আমরা বাংলা নিয়ে পড়ে আছি। সে কারনে নিজের ভাষা আমরা অবহেলায় ফেলে রাখছি। বাংলা ভাষার শিক্ষা আমাদের চাকরির সুযোগ দিচ্ছে কিন্তু চাকমা ভাষাতো তা দিচ্ছে না। বাংলা ভাষা চর্চা সম্মান, মর্যাদা, জীবিকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। আর চাকমা ভাষা চর্চা কি দিচ্ছে? কিছুই না । যদিও শুনতে খারাপ লাগবে তবুও এটাই সত্যি।

কিন্তু একসময় পাহাড়ি বৈদ্যরাও তাদের বিভিন্ন তাল্লিক শাস্ত্রে (চাকমা বর্ণমালায় লেখা চিকিৎসা বিদ্যার বই) চাকমা বর্ণমালা ব্যবহার করতেন-

বৈদ্যরা ব্যবহার করতেন কারন তাঁরা বাংলা জানতেন না। তবে বর্তমানে তারাও বাংলায় লিখছেন। এখন আমাদের যা দরকার তা হচ্ছে চাকমা বর্ণমালার চর্চা। চাকমা বর্ণমালায় চিঠিপত্র লেখা। চিঠিতো এখন আর কেউ লেখে না। ফেসবুকের স্ট্যটাস ও তো চাকমা বর্ণমালা ব্যবহার করে দিতে পারে। ভারতের চাকমারা কিন্তু এদিক দিয়ে আমাদের চেয়ে বেশ এগিয়ে আছে। তারা চাকমা বর্ণমালায় ‘পজ্জন’ (চাকমা রূপকথা/ছোটগল্প) বই বের করেছে। বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকাও বের হয়েছে। ভারতের ত্রিপুরায় সম্ভবত তৃতিয় শ্রেণী পর্যন্ত চাকমা বর্ণমালায় শিক্ষা দেওয়া হয় এবং মিজোরামে সপ্তম-অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত।

আমাদের এখানেও নিজস্ব বর্ণমালায় পাঠদানের কথা অনেকদিন ধরে শোনা যাচ্ছে। পত্রিকায় দেখলাম, ২০১৭ সালে পাঁচটি ভাষায় বই বিতরণ করা হবে-

আমারতো বিশ্বাস হয় না এত তাড়াতাড়ি তা সম্ভব হবে। এ প্রক্রিয়াটার সাথে আমি প্রথম থেকে জড়িত আছি। আজকে প্রায় চার, পাঁচ বছর ধরে প্রক্রিয়াটা চলছে। ঢাকায় মিটিং হচ্ছে, সেখানে আমাকে ডাকছে। মিটিংএ যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত যখন টেকনিক্যাল বিষয়গুলো চূড়ান্ত হলো মন্ত্রণালয় বললো ‘টাকা পাবো কোথায়?’। টাকা যদি নাই থাকে তবে এতদিন ধরে এসব মিটিং সিটিং এর কি দরকার ছিলো ? আমার আর বিশ্বাস হয় না । এরপরে আবারও মিটিংএ আমাকে ডেকেছিলো। আমি যাইনি। আমি চেয়েছিলাম এ বিষয়ে তিন পার্বত্য জেলায় এ বিষয়ে একটি মিটিং হোক। কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে একটা মিটিং। যেটার নেতৃত্ব দেবে জেলা পরিষদ বা আঞ্চলিক পরিষদ। সেখান থেকে কর্মশালার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে বইগুলোর লেখক কারা হবে। শুধু অমুক তুমি লেখ, তমুক তুমি লেখ বললেতো হবে না। ভুলভ্রান্তি হলে তার দায়িত্ব কে নেবে? ফোরামের মাধ্যমে, আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে কারা লিখবে। যদি সত্যিই ২০১৭ সালে বই বের হয় তাহলে কি লেখা হয়েছে কে জানে!

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তো আপনাদের বন্ধু ছিলেন?

না, ঠিক বন্ধু নয়। লেখালেখির মাধ্যমেই আমাদের মধ্যে বন্ধুত্তের দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি হয়।

নাট্যকার মামুনুর রশীদের সাথে ওতো আপনাদের খুব হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক?

উনার সাথে মূলত সুহৃদের বন্ধুত্ব। মামুনুর রশীদ সাহেব তখন একটি প্রেস চালাতেন। সেই প্রেসে আমারা যে লিটল ম্যাগাজিন বের করতাম, সেগুলো ছাপানো হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন এভাবেই সুহৃদের সাথে মামুনুর রশীদের পরিচয়, যে সম্পর্কটা এখনও আমাদের মাঝে রয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী সংস্কৃতি মেলা আয়োজনে উনার অবদান রয়েছে। তখনকার সময়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম একটা নাট্য সপ্তাহের আয়োজন করবো। জাকের সদস্যরা মিলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এরপর অর্থের সন্ধানে আমরা ঢাকার বন্ধুদের কাছে গেলাম। তখন তারা নাট্যসপ্তাহ না করে আদিবাসী মেলা আয়োজনের পরামর্শ দিলেন, যাতে ফান্ড সংগ্রহে সুবিধা হয়। আর আমরাও রাজী হয়ে গেলাম। যাইহোক, অনেকের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতির টাকা পাওয়া না গেলেও অনেকের কাছ থেকে আমরা সহযোগিতা পেয়েছি। এরপর ১৯৯৮ সাল থেকে আমরা প্রতিবছর বিভিন্ন জনের সহযোগিতা নিয়ে আদিবাসী মেলা আয়োজন করে আসছি যদিও মাঝখানে দুই বছর বাদ পড়েছে।

এই আদিবাসী মেলায় শুধুতো পার্বত্য চট্টগ্রাম নয় সমতলের আদিবাসীদেরও অংশগ্রহণ রয়েছে।

হ্যাঁ। সাঁওতাল, গারো, ওড়াও, মান্দি, খিয়াং, ম্রোসহ মোটামুটি সব আদিবাসীদের অংশগ্রহণই রয়েছে। তাদের সুখ দুঃখের গল্প শোনার সুযোগ হয়।

গেংকুলি গান শোনার সৌভাগ্য তো এ প্রজন্মের সবার হয়নি। আপনাদের এই আয়োজনের মাধ্যমে তো এসব সম্ভব হলো।

হ্যাঁ। গেংকুলি গান উজ্জীবিত হলো।  আমরা গেংকুলি গানের অডিও রেকর্ডিং করেছি কিন্তু টেপরেকর্ডারে হওয়ার কারনে অনেক অডিও নষ্ট হয়ে গেছে। সারারাত ধরে পালা/গল্প রেকর্ডিং করেছি কিন্তু ক্যাসেটগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এরপর কিছু সিডিতে রেকর্ড করা হয়েছে যেগুলো ’জাকে’র কাছে আছে। ‘রাধামন ধনপুদি’ পালাসহ ভিবিন্ন সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সর্ম্পকিত বইও ’জাকে’র পক্ষ থেকে বের করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের আদিবাসী পিঠাও বাজারজাতকরণের উদ্যোগে আমাদের মাধ্যমেই সফল হয়েছে বলে আমি মনে করি। এখন বাজার বা যেকোন অনুষ্ঠানে আদিবাসী পিঠাগুলোর ব্যবহার হয়।

কবি ও নাট্যকার। কোনটিতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন? আপনিতো চাকমা নাট্যকার হিসেবে অনেক প্রসিদ্ধ এবং জনপ্রিয়।

দুটোই আমার সমানভাবে এসেছে। নাটক জন্ম দেওয়া অনেক সময়ের ব্যাপার। অনেক ভাবনা জড়ো করতে হয়। বছরখানেক বা এরও বেশি সময় চলে যায়। সেক্ষেত্রে কবিতা হয়তোবা একটু তাড়াতাড়ি লেখা সম্ভব তবে দুটোই আমার কাছে সমান গুরুত্ব বহন করে। ইদানিং বিভিন্ন কাজের চাপে নাটকে মনযোগ দিতে পারছি না।

নাটকের মাধ্যমেতো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। কারণ যার অক্ষর জ্ঞান নেই সে তো আর কবিতা পড়তে পারছে না। কিন্তু নাটকেতো সে তার নিজস্ব চেতনাবোধের সাথে নাটকের বক্তব্য মিলিয়ে নিতে পারছে। এজন্য অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন হওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না। আপনারা কখনও গ্রামে গিয়ে নাটক প্রদর্শন করেছেন? একদম সাধারন মানুষের কাছে?

সব অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষও কি আর কবিতা পড়ছে! গ্রামে গ্রামে আমরা যে নাটকটা করেছি সেটা হচ্ছে আমার একটা নাটক ‘হক্কানীর ধনপানা’। এটি বহুবার মঞ্চায়িত হয়েছে। জাকও হয়তো বলতে পারবেনা ঠিক কতবার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলার শিক্ষক কুন্তল বড়ুয়া আমার এই নাটকের বিষয়ের উপর পিএইচডি করেছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য চর্চার বর্তমান অবস্থা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বর্তমান সাহিত্য চর্চা বিষয়ে আমি সন্তুষ্ট। আমাদের সাহিত্যের বিকাশ হবে বলে আমি মনে করি। অনেকেই কাজ করছেন। তবে গদ্য সাহিত্য নেই। গদ্য সাহিত্য বলতে আমি গল্প-উপন্যাসকে বোঝাচ্ছি। এসবের মাধ্যমে একটি জাতির ইতিহাস, সুখ, দুঃখের ক্যানভাস তৈরি করা যায়। চাকমা উপন্যাস, গদ্য সাহিত্য যতদিন বিকশিত হচ্ছে না ততদিন আমরা বিশ্ব সাহিত্যে শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারবো না। কবিতার মাধ্যমে তো সব তুলে ধরা সম্ভব হয় না। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও যেমন বারবার বলেছেন- চাকমা উপন্যাস চাই। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে শেষবার তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “মৃত্তিকা, উপন্যাস কি লেখা হয়েছে, না এখনও হয়নি?” আমি বললাম, হয়নি। তিনি বললেন “তোমাকেই শুরু করতে হবে”। তাঁর কথায় হোক বা নিজের ভিতরকার আকুতি থেকে হোক আমি উপন্যাস লেখায় হাত দিয়েছি। কিছু অংশ একটি সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। দেখি কি হয়। পরিকল্পনা আছে। যদি বেঁচে থাকি তাহলে হয়তো লেখা হবে। অনেকেই লেখার চেষ্টা করছেন। এটা ভালো। উপন্যাসতো শুধু লিখলেই হবে না এর মধ্যে সাহিত্য থাকতে হবে, ইতিহাস থাকতে হবে, উপন্যাসের গঠনশৈলী থাকতে হবে, শিল্প থাকতে হবে। শুধু সাদা কাগজে কালো কালি বর্ণনা দিয়ে গেলেতো আর উপন্যাস হবে না। জদবদে গরি কলম ধরা পরিবো (দৃঢ়তার সহিত কলম ধরতে হবে)। সেই কলম ধরার বীর আমাদের জাতি জন্ম দিতে পারছে কিনা, কে জানে?