মানস চৌধুরী

আধুনিক সাহিত্যকে আমি পরিপূর্ণভাবে বুর্জোয়া ও পাতিবুর্জোয়া সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি হিশেবে দেখি মানস চৌধুরী


 

[মানস চৌধুরী। জন্ম: বরগুনা, ২৮ মার্চ ১৯৬৯। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক। কথাশিল্পী, সংকলক, অনুবাদক, কলামিস্ট, অভিনেতা ইত্যাদি। প্রকাশিত গ্রন্থ : নৃবিজ্ঞানের প্রথম পাঠ (রেহনুমা আহমেদ-এর সঙ্গে যৌথ বিরচিত), কর্তার সংসার: নারীবাদী রচনা সংকলন (সায়দিয়া গুলরুখ-এর সঙ্গে যৌথ সম্পাদিত), এইডস ও যৌনতা নিয়ে ডিসকোর্স (সায়দিয়া গুলরুখ-এর সঙ্গে যৌথ বিরচিত), নৃবিজ্ঞান পরিচিতি (প্রশান্ত ত্রিপুরা ও রেহনুমা আহমেদ-এর সঙ্গে যৌথ বিরচিত), মুক্ত আলোচনা (আইনুন নাহার-এর সঙ্গে যৌথ সম্পাদিত), সাম্প্রতিক নৃবিজ্ঞান (নুরুল আলম এবং আইনুন নাহার-এর সঙ্গে যৌথ সম্পাদিত), চর্চা (জহির আহমেদ-এর সঙ্গে যৌথ সম্পাদিত), কাকগৃহ(ছোটগল্প), আয়ানাতে নিজের মুখটা(ছোটগল্প), ময়নাতদন্তহীন একটি মৃত্যু,(ছোটগল্প)। তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন দুপুর মিত্র। এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হয়েছিলো অলস দুপর-এ ১১ জুন ২০১২-তে। কথাবলির পাঠকদের জন্য আবার প্রকাশ হলো।]

 

কবিদের বা কবিতার নৃবৈজ্ঞানিক পাঠ কেমন হতে পারে?

‘নৃবৈজ্ঞানিক’ পাঠ বা বিশ্লেষণ প্রায়শই একটু রিডাকশনিস্ট আব্দার ধরনের হয়ে থাকে। সতর্ক না থাকলে এটা একধরনের কক্ষাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে সাহিত্যপাঠের ক্ষেত্রে, তেমনি আবার সংশ্লিষ্ট আলোচককে বাড়তি একটা উল্লাসও দিতে পারে তার স্বীয় শাস্ত্র বা প্রশিক্ষণের বদৌলতে। যেমন ধরা যাক, আমি যদি নৃবিজ্ঞানের লোক না হয়ে পরিসংখ্যানের লোক হতাম কবি বা কবিতার পারিসংখ্যানিক পাঠ নিয়ে আপনার কৌতূহল কম হতো। তবে কবিতাকে বিষয়বস্তু, কিংবা যোগসূত্র কিংবা উপলক্ষ করে নিবিড় সমাজ পাঠ বা বিশ্লেষণ সম্ভব, অল্পবিস্তর হয়েছেও বটে। একদিকে কবিতার ইতিহাস গবেষণায় ইতিহাসবিদ বা নৃবিজ্ঞানীর অংশ থাকতে পারে। আরেকদিকে, খোদ কবিতাপাঠ ও কবির সামাজিক সত্তা পড়ালেখায় নৃবিজ্ঞানীরা কাজ করতে পারেন। প্রায়শই এগুলি স্বতপ্রণোদিত এবং ঠিক কুস্তি লড়ে প্রতিষ্ঠান বানিয়ে হবার কথা নয়।

গল্প-উপন্যাস লেখার দিকে নৃবিজ্ঞানীদের ঝোঁক বেশি থাকে কেন?

এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে আমি আপনার মতো নিশ্চিত নই। বাংলাদেশেই ধরুন না! নৃবিজ্ঞানীদের থেকে ডাক্তাররা বোধহয় বেশি লেখেন এবং কয়েকজন দারুণ লেখেন। তবে নৃবিজ্ঞানীদের নিজস্ব বর্গের মধ্যে কবিতার থেকে যদি গদ্য লেখার প্রবণতা বেশি থাকে তার শাস্ত্রীয় একটা কারণ থাকতেই পারে। নিবিড় গবেষণা দলিল লেখার প্রয়োজন থেকে বিবরণীর একটা তালিম তাদের থাকে। তবে এগুলি সবই একটা কাগুজে হিশেব-নিকেশ। বাস্তবে তারা বেশি লেখেন ‘উন্নয়ন’ পত্রাবলি। কিন্তু কবিতা পড়তে ভাল লেগেছে ঢাকায় এরকম অন্তত তিনজন কবির কথা মনে পড়ল যাদের ডিগ্রি নৃবিজ্ঞানে। ফলে খুব মুস্কিল এসব পর্যবেক্ষণে।

গল্প-উপন্যাসকে আপনি কীভাবে সাধারণত পাঠ করেন?

ইদানীং কম পড়ি। পড়তাম যখন সোজাসাপ্টা বিধি। কয়েক পাতা পড়ে ভাল লাগছে কিনা। একক পাঠকের অভিরুচির এই বিষয়টা বোধহয় খুব জটিল জায়গা। নিয়ম করে বদলানো খুব কঠিন। বুদ্ধদেব বসু’র বহুল আলোচিত “রাত ভরে বৃষ্টি” (ঠিক লিখলাম তো?) এতটুকু বই এবং আমার ভাল লাগল না। গজেন্দ্র কুমার মিত্রের “কান পেতে রই” বিশাল একটা বই, প্রায় ৯০০ পৃষ্ঠার এবং তেমন আলোচিত নয়। কিন্তু আমার জন্য অসামান্য এক কিতাব ছিল—গভীর, সাবলীল, বিষাদকার এবং মনুষ্য-সম্পর্কের অনুসন্ধানময়। এরকম আরকি!

লেখা আর অ্যাক্টিভিজমের সম্পর্কটা কেমন?

যদি অপরাধ না নেন, আমার জন্য প্রশ্নটা অনেক বেখাপ্পা। ধরুন চাইলে তো এভাবেও জিজ্ঞেস করা যায় ‘ডাক্তারি আর অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে সম্পর্কটা কেমন, কিংবা তেলের মিল চালানোর সঙ্গে? যেহেতু যাকে অ্যাক্টিভিজম বলা হয়ে আসছে তার একটা বড় প্রকাশ লেখালেখি—তা সে লিফলেট থেকে ঢাউস পুস্তক হোক—হয়তো সেজন্য প্রশ্নটা এসেছে। এসে থাকে। প্রশ্নটা নিজেই বড় একটা অনুমান। আজকাল বহুজাতিক এনজিও-র চাকরি-বাকরিও ‘অ্যাক্টিভিজম’ বলা হয়ে থাকে। সংজ্ঞায়নের এই সমস্যা আরো বাড়ল বোধহয়।

আমাদের দেশে লেখক আর অ্যাক্টিভিস্টদের আলাদা করে দেখা হয় কেন?

কোথায়? আপনার আগের প্রশ্নটাই দেখুন না! বরং লেখালেখি করা মানুষজন যতো সহজে ‘সমাজের জন্য কিছু করলাম’ ধরনের তৃপ্তি বোধ করেন, এবং তাদের সেই ‘সমাজকর্ম’ লোকজন যথেষ্ট কদর না করলে রীতিমতো বিরক্ত হন, ততোটা অন্য বৃত্তির লোকজন বোধহয় করেন না। বাস্তবে যাকে এক্টিভিজম বলা হয় এটা, আমি মনে করি, একেবারেই পেশাজীবী ব্যক্তির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থেকে আসে, বা অন্তত আত্ম-প্রতিকৃতির আকাঙ্ক্ষা। শ্রমিক শ্রেণীর মানুষজনের জন্য এটা একদম আলাদা। তিনি তার আকাঙ্ক্ষার থেকেও এক প্রগাঢ় জীবন যাপন করেন।

বামপন্থিরা নানাভাবে সক্রিয় থাকলেও সাহিত্যে তাদের নিষ্ক্রিয় দেখা যায় কেন?

একটু অস্বস্তি লাগছে, কারণ এই পর্যবেক্ষণটাও আমার ঢিলেঢালা লাগছে। একদম প্রশ্নটা পড়ার সাথে সাথেই যে নামগুলি মাথায় এলো, খ্যাতনামা বা পরিচিতদের মধ্য থেকে, সেগুলি এরকম: ফরহাদ মজহার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আজফার হোসেন, মামুন হোসাইন, জাকির তালুকদার, পাপড়ি রহমান, তসলিমা নাসরিন থেকে শুরু করে ফারুক ওয়াসিফ, মাহবুব মোর্শেদ... বড় হবে এই তালিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছেন কিংবা সদ্য স্নাতক হয়েছেন এমন লেখকদের অন্তর্ভুক্ত করলে তালিকাটা বিশাল বড় হবে। এদের মধ্যে কেউ জোরাজুরি করে “বামপন্থি” না-থাকতে চাইতেই পারেন। বরং এটা একটা অভূতপূর্ব ঘটনা, হয়তো রাজনৈতিকভাবে ঝামেলাপূর্ণও বটে, যে বাংলাদেশে সাহিত্য ও “শিল্পকলা”য় বিচরণশীল মানুষজন অধিকাংশই কখনো না কখনো “বামপন্থি” ছিলেন। আমি যাদের নাম উল্লেখ করলাম তাদের অধিকাংশই ভীষণ সক্রিয়—সাহিত্যে এবং অন্যত্র। ছিলেন, বা আছেন। কেউ ঠিক গল্প-কবিতা লেখেন না। কিন্তু তাতে কী? তারা লেখেন সাহিত্যতত্ত্বীয় লেখা, বা পঠন-পর্যালোচনামূলক লেখা, কিংবা একেবারেই রাজনৈতিক-অর্থশাস্ত্র। আমার তালিকায় আরো কিছু নাম বাদ পড়ল একদম আমার ক্ষিপ্র স্মৃতিশক্তির অভাবে; লোকজনের অভাবে নয়। তবে যাকে ‘সৃজনশীল’ সাহিত্য বলা হয় তা নিয়ে প্রচলিত দলভুক্ত বাম নেতৃবৃন্দের মধ্যে খুব উৎসাহ না-থাকতে পারে, অন্তত বাংলাদেশে। কিন্তু সেটা উল্টা ক্ষেত্রেও সত্যি। ওই অর্থে ‘সাহিত্যচর্চা’ করা লোকজন খুব যে ফূর্তি নিয়ে বাম আন্দোলনের কর্মীদের রচনাদি পড়েন তারও লক্ষণ কম দেখি। একঘেয়ে, পুনরুক্তিমূলক লেখকদের কথা বাদ দিলাম, সত্যেন সেন-এর মতো ক্ষুরধার লেখকদের নিয়েও তো তেমন আগ্রহ দেখি না সমকালীন সাহিত্যচর্চাকারদের মধ্যে।

এই প্রশ্নটা আমার দিক থেকে আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ, এবং গুরুত্বপূর্ণ ঢিলা প্রশ্ন। বাংলাদেশ লেখক শিবির-এর বর্তমান হাল-হকিকত যাই হোক না কেন, বাংলাদেশের সাহিত্য প্রবাহের ইতিহাসে এর অংশগ্রহণ কিন্তু খুবই ভাববার মতো। এটি মৌলিকভাবে একটি ‘বামপন্থি’ পাটাতন এবং একটা সময়ে ঢাকা এবং প্রত্যন্তের বহু সিরিয়াস লেখক এর কাতারভুক্ত ছিলেন। এতটাই যে এই সংগঠনের অস্তিত্ব এমনকি বাংলা একাডেমীর মতো একটা প্রতিষ্ঠানকে ঢ্যাবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সক্ষম ছিল। উত্তরকালে অর্ন্তবিবাদ সংগঠনটিকে হীনবল করে দেয়। সেটি স্বতন্ত্র প্রসঙ্গ। ফলে, আমি সবিনয়ে এই পর্যবেক্ষণটির দুর্বলতাকেই স্মরণ করিয়ে দিতে চাইব।

গল্প-উপন্যাস লিখিয়েদের কি ইদানিং এনজিও ইস্যু নিয়ে বেশি কাজ করতে দেখা যায়? দেখা গেলে কেন? না দেখা গেলে কেন?

এটা ইন্টেরেস্টিং প্রশ্ন, আবার কঠিনও। কখনো কখনো বিরক্ত হয়ে আমিও যে ভেবে বা বলে বসি না তা নয়, কিন্তু ‘এনজিও ইস্যু’ বলতে একটা জেনেরিক বর্গ দিয়ে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে সেটা নিয়ে সতর্ক থাকার পক্ষে আমি। একটা হতে পারে এই প্রশ্নে এনজিও ইস্যু বলতে উন্নয়নবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বোঝানো হচ্ছে। কোনো সন্দেহ নেই যে কেবল সাহিত্যিক নন, গড়ে এটা আধুনিক বাংলাদেশে একটা শক্তিশালী ডিসকোর্স, ভাবনার পাটাতন। উপন্যাস বা গল্প লিখিয়েগণ এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বন্দি হয়ে যেতে পারেন। অন্তত একাধিক ক্ষেত্রে এই নজির পাওয়া যায়। আরেকটা হতে পারে, গল্পের কাঠামো গড়নের দিক থেকে মনোগ্রাফ বা রিপোর্টধর্মী, সেই হিশেবে ক্লিষ্টপাঠ্য। সেটার অনুভূতিও কারো কারো লেখা পড়ে হতে পারে। আমি খুশি হব যদি এসব নিন্দা বা সমালোচনা করবার ক্ষেত্রে একটা কার্যকরী সংজ্ঞা বা বর্গ যদি আমরা নির্ধারণ করে নিতে পারি। এনজিওসমূহ যদি তাদের প্রচারণা বা কর্মসূচির অংশ হিশেবে ভিস্যুয়াল মাধ্যমে গল্প গাইড করতে পারে, যেমন : টিভি নাটক বানানো, তাহলে গল্পকাররা নিজে থেকেই তাদের প্রচারণার কাজ গল্পে শুরু করে দিলে সমস্যা কী? আপনি এরকম গল্প লিখতে, বা পড়তে, ভালবাসতে নাই পারেন। কিন্তু করুন না তিনি! কী সমস্যা?!

নারীলেখক হলেই নারী ইস্যু নিয়ে নারীকে বেশি লিখতে দেখা যায় কেন?

নারী প্রসঙ্গ বা ইস্যু হিশেবে আসার চেয়েও আমি নারী লেখকদের অংশগ্রহণে নারী-চৈতন্যের অনেক জোরদার জায়গা দেখি। সেটার একটা মস্ত কারণ নিশ্চয়ই এই যে গড়ে পুরুষ লেখকগণ লিঙ্গীয় সম্পর্ক কিংবা নারীর সামাজিক অস্তিত্বের টানাপড়েন নিয়ে অনেক কম সংবেদনশীল। আবার শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে গজেন্দ্রকুমার, হাসান আজিজুল থেকে শুরু করে মতি নন্দী—আপনি কিন্তু পুরুষ লেখকদেরও নানান ধরনের সংবেদনশীল নারী-নির্মাণ পান। হয়তো ধারাবাহিক নন তারা। কিন্তু নারীরা নিজেরা যখন লেখেন অনেকেই এই অভাবটা লক্ষ করেন এবং একটা দায়িত্ব নিয়ে নেন। আমি বরং তাদের এই সজাগ উপস্থিতি পুরুষ সাহিত্যকারদের জন্য জরুরি বলে মনে করি। যদি সত্যি সত্যি আপনি লিঙ্গীয় চৈতন্য নিয়ে সজাগ থাকতে চান, আপনার সজাগ নারী সহকর্মীরা আপনাকে অনেক পথ দেখিয়ে দিতে পারেন।

আপনার লেখালেখি নিয়ে কিছু বলুন। আপনি গল্প লিখতে গিয়ে কোন বিষয়ে জোর বেশি দেন এবং কেন?

আমি ধরেই নিচ্ছি আমার বিদ্যায়তনিক লেখালেখি নয়, কথা হবে আমার তথাকথিত ‘সৃজনশীল’ লেখালেখি নিয়ে। আমি ছোটগল্প লিখতে শুরু করার সময় একটা ধারণা ছিল যে কলাম বা এরকমের লেখা ছাপানোর থেকে দৈনিকে ছোটগল্প প্রকাশ করা অপেক্ষাকৃত সহজ। আমার এই ধারণাই একমাত্র কারণ নয় সত্য, কিন্তু গল্প লেখাতে হাতে-খড়ি দেবার ক্ষেত্রে এটা একটা কারণ হিশেবে কাজ করেছে। আমার এই ধারণাটি আর এখন নেই। বরং প্রকাশিত হওয়া, নানান কারণে, নানানভাবেই কঠিন এবং প্রায়শই একটা ‘ক্লাব’ পদ্ধতির অনুসারী।

আমি পরিচিতির দিক থেকে নগণ্য লেখক। ফলে এ বিষয়ে স্পষ্ট মন্তব্য করবার আগ্রহ খুব সহজেই বেকুবি হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু একটা পেশাগত দায়িত্ব হিশেবে সেটাও খুলে বলার চেষ্টা করছি। নিজের লেখার ক্ষেত্রে আমি কী হতে চাইনি তা আগে বলতে পারি। যেগুলি খুব বুদ্ধি-ভারাক্রান্ত কিংবা সেন্টিমেন্টাল চরিত্র নিয়ে কাজ করে সেসব গল্প আমাকে টানেনি। আমি তা না-লিখতে চেয়েছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেগুলিকে ‘এক্সপেরিমেন্টাল’, ‘উত্তরাধুনিকতাবাদী’, ‘যাদু বাস্তবতা’ ইত্যাদি বলে ঢাকায় চালানো হয়েছে সেগুলি আমাকে টানেনি। পরিস্কার করা দরকার যে তা এসব ধারার দুর্বলতার কারণে নয়, বরং আমি এমন কোনো প্রস্তুত পাঠকও নই যে গরু একে নিচে গরু না লিখলে আমি চিনতে পারি সব সময়। সকল ধারার গল্প পড়েই তার ঠিকুজি-কুলুজি আমি বুঝে যাই না। আর নানান ধারাকে বিরোধিতা করার কোনো কারণই নেই। কিন্তু এখানে এসব ধারার নামে চালু অনেক গল্প খোদ গল্প হিশেবেই আমাকে আকর্ষণ করেনি। আমি সেসব না-লিখতে চেয়েছি। বিপ্লবী চেতনা নিয়ে ঢাকায় কবিতা লেখার ঘোষণা বেশি হয়েছে, গল্প কম। কিন্তু কিছু গল্প এখন মনে না-পড়লেও আমি সনাক্ত করতে পেরেছিলাম। একটা আলগা ঘোষণাই পড়া গেছে, গল্পটা নয়। ফলে আমি নিশ্চিত জানতাম কী আমি লিখতে চাই না। আমাকে টানে গল্প, এমনকি যেখানে প্রায় কোনো গল্পই নেই সেখানকারও গল্প হয়ে-ওঠার প্রক্রিয়াটি। মানে, বিবরণি বা কথকতা বা ন্যারেশন। সেই ম্যাজিক যা প্রায় কিছু-না কে একটা গল্প বানিয়ে ফেলে। সেটাই কথন সামর্থ্য। আড্ডাতে এই গুণটা আমরা সহজে আলাদা করতে পারি। আসলে লেখাতেও পারা যায়। রচনা আমার কাছে আদ্যোপান্ত একটা শৈলীর বিষয় বা ক্র্যাফটস। ফলে, আমি হতে চেয়েছি এক নিরন্তর কথক, বিবরক। এটাই আমার গল্পে যেটাকে বললেন জোর দেয়া, সেই জোর দেয়ার জায়গা। তবে লিখতে গিয়ে আমি টের পাই, জোরটা না-দিলেই এই কথকতা আমার সবচেয়ে ভাল কাজ করে। জোর দিতে গেলেই ধেবড়ে যায় তীক্ষ্ণতাটা। হয়তো এসব দিক দিয়ে ভাবলে, আমাকে সনাতনী ধারার গল্পকার বলা সম্ভব।

আমরা তিরিশের দশককে আধুনিকতার নামে ইউরোপীয় সাহিত্য আমদানিকারক বলে দায়ী করি। কিন্তু কবিতা-গল্প-উপন্যাস এসবের ধারণা আগে ছিলই না। ছিল অন্যভাবে বা পাঁচালি, পুরাণ ইত্যাদি রূপে। অথচ সেদিকের দিকে যাই না। আবার লোক সাহিত্য বলে মৌখিক সাহিত্যের বেড়ে ওঠা জগতকে পেছনে ঠেলে দেই। এসব কেন? এ নিয়ে কিছু বলবেন?

এটা একটা দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। আমি হয়তো সেরা আলোচক নই, কিন্তু যে বিষয়ে আমার চাকরি তাতে আমার কিছু মতামত ও পাঠ থাকা প্রায় অবশ্য-কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তবে আমি চাইব সেটা একটা স্বতন্ত্র আলাপে হোক।

এটা বলার পরও এটুকু এখানেই এগিয়ে রাখতে চাই যে, আধুনিক সাহিত্যকে আমি পরিপূর্ণভাবে বুর্জোয়া ও পাতি-বুর্জোয়া সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি হিশেবে দেখি। সারবস্তু বিচারে অবশ্যই কিছু প্রতিপক্ষীয় চর্চা হয়ে থাকতে পারে, ইতিহাসে তার নজিরও আছে বিস্তর। কিন্তু কথ্য সভ্যতা ও অনুশীলনের বিপরীতে লেখ্য সভ্যতার সর্বাত্মক বিজয়, সর্বজনীন সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির বিপরীতে অলিগ্যার্কিক কিংবা হেজেমনিক সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি গড়ে-ওঠা ইত্যাদি মনুষ্য জীবনের বিস্তারিত বৈষম্য প্রণালীর সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রশ্নটি নিয়ে ভাবলে আমরা ইতিহাসের অমোঘ বদলগুলিকে পুনর্বদল করে দিতে পারব না, তবে সাহিত্য-অভিব্যক্তির ঐতিহাসিক কর্তব্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে দিক-নির্দেশনা পেতে পারি। এটা বিশাল একটা প্রসঙ্গ, এবং একই সঙ্গে বিষাদকর।

 

[এই সাক্ষাৎকারটি কপিলেফ্ট। এর যে কোনো অংশ অবিকৃত রেখে যে কেউ শুধুমাত্র অবাণিজ্যিক বা অলাভজনক উদ্দেশ্যে নকল ও পরিবেশন করা যাবে।]